বর্ষাকালে পাহাড়ে জুমচাষের মৌসুম এখন পুরোদমে চলছে। সবুজে মোড়ানো পাহাড়জুড়ে জুমক্ষেতে ধানের শীষ আসতে শুরু করেছে। বছরের এই সময়টিতে পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই শত শত পর্যটক বিভিন্ন এলাকা ভ্রমণে আসছেন। তবে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে অনেক পর্যটকের অসচেতন ও দায়িত্বহীন আচরণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন পাহাড়ের আদিবাসী জুমচাষীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক পর্যটক কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই আদিবাসীদের জুমক্ষেতে প্রবেশ করছেন। ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ কিংবা ঘোরাঘুরির জন্য ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে হাঁটার কারণে নষ্ট হচ্ছে ধানসহ বিভিন্ন ফসল। একটি জুমক্ষেত শুধু একটি কৃষিজমি নয়; এটি একটি আদিবাসী পরিবারের সারা বছরের খাদ্য, আয় ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন। ফলে সামান্য ক্ষতিও তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও খাদ্য সংকট সৃষ্টি করে।
পাহাড়ের আদিবাসীরা সহজ-সরল, শান্তিপ্রিয় ও অতিথিপরায়ণ মানুষ। তাই অনেক ক্ষেত্রেই তারা পর্যটকদের জুমক্ষেতে প্রবেশে বাধা দিতে পারেন না। আবার অনেক জুমচাষী রয়েছেন, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে বা বুঝতে পারেন না। ফলে বহিরাগতদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় তারা নিজেদের ফসল রক্ষায় কার্যকরভাবে আপত্তি জানাতেও অসহায় হয়ে পড়েন। এই ভাষাগত সীমাবদ্ধতা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই বিনা অনুমতিতে জুমে প্রবেশ করেন, যার ফলে পদদলিত হয়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান ফসল।
শুধু ফসল নষ্ট করাই নয়, অনেক পর্যটক জুমের মাঝখানে খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল, প্লাস্টিকের গ্লাস, চিপসের মোড়কসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলে রেখে যাচ্ছেন। এসব প্লাস্টিক সহজে পচে না এবং দীর্ঘদিন ধরে মাটি ও পানির গুণাগুণ নষ্ট করে পরিবেশ দূষণের সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে এটি বন্যপ্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুমের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে পর্যটকদের দায়িত্বহীন আচরণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং অপরিকল্পিত ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এতে জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং কৃষকদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সচেতন মহলের দাবি, জুম এলাকা সংরক্ষণে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।
পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করুন, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের প্রাণ—আদিবাসী কৃষকের জুম, ফসল ও জীবিকার ক্ষতি করবেন না। অনুমতি ছাড়া জুমে প্রবেশ করবেন না, ময়লা-আবর্জনা ফেলবেন না। পাহাড় ও প্রকৃতি রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।