এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। রেকর্ড তাপমাত্রায় বিপর্যস্ত জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। এই তীব্র গরমে টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটি সিংহ মারা গেছে। তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত গরমে সৃষ্ট শারীরিক চাপ বা ‘হিট স্ট্রেস’কে সন্দেহ করা হচ্ছে।
টোকিওর বৃহত্তর মহানগর এলাকার হিনো শহরে তামা জুলজিক্যাল পার্ক অবস্থিত। জুলাইয়ের শেষ দিকে চিড়িয়াখানাটি সিংহের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয়। কারণ, কয়েকটি সিংহের মধ্যে ক্ষুধামান্দ্য ও অবসাদের মতো শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জুলাইয়ের শুরুতে শুরু হওয়া তাপপ্রবাহের সঙ্গে সিংহগুলোর অসুস্থ হয়ে পড়ার সময়ের মিল রয়েছে। একই সময়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে এমন একটি ‘সুপার এল নিনো’ আবহাওয়া পরিস্থিতিও শক্তিশালী হচ্ছে।
অসুস্থ সিংহগুলোকে ঠান্ডা রাখতে পানি ছিটানো এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বড় ফ্যান দিয়ে বাতাস দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তাদের শিরায় তরল ওষুধও দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে ১০টি সিংহকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু ২৮ জুলাই তিন বছর বয়সী মাদি সিংহ মুগি মারা যায়। তিন দিন পর মারা যায় ১১ বছর বয়সী মাদি সিংহ ইচিগো। এরপর রোববার ১৫ বছর বয়সী মাদি সিংহ লুয়েনার মৃত্যু হয়।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলেছে, ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে তিনটি সিংহের শরীরেই পানিশূন্যতা ও একাধিক অঙ্গের কার্যকারিতা বন্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে।
এতে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত গরম তাদের মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
তামা জুলজিক্যাল পার্কের আরো চারটি সিংহ সুস্থ হয়ে উঠছে। তবে তিনটি এখনো অসুস্থ। তাদের চিকিৎসা চলছে।
জাপানে টানা পাঁচ দিন ৪০ ডিগ্রি
জাপান এবার দীর্ঘ ও তীব্র তাপপ্রবাহের মুখে পড়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে দেশটির কিছু এলাকায় টানা পাঁচ দিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি ছিল। দেশটির ইতিহাসে এটাই এমন তাপমাত্রার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ঘটনা।
দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় বারবার হিটস্ট্রোকের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র যে, জাপানের আবহাওয়া সংস্থা চলতি গ্রীষ্মে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পৌঁছানো দিনের জন্য নতুন একটি শব্দ চালু করেছে। এর অর্থ মোটামুটি ‘নিষ্ঠুরভাবে গরম দিন’।
তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি কুমামোতো প্রিফেকচার। গত সপ্তাহে সেখানে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর পর সোমবার এলাকাটিতে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এই তাপপ্রবাহ নতুন বিপদ তৈরি করেছে। অনেকেই বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ায় গাড়ির মধ্যে রাত কাটাচ্ছেন।
জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সত্তরের কোঠার এক নারী গাড়ির মধ্যে সন্দেহজনক হিটস্ট্রোকে মারা গেছেন।
এখনো ৮ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। প্রায় ৪৫ হাজার পরিবারের পানির সংযোগ নেই। ফলে প্রচণ্ড গরম থেকে নিজেদের রক্ষা করা তাদের জন্য আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রার কিছুটা ওঠানামা হতে পারে। তবে জাপানের বড় অংশে দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তির কোনো পূর্বাভাস নেই। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির মাঝামাঝি বা তারও বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতেও গরমে সিংহশাবকের মৃত্যু
এ বছর এশিয়ার অন্য দেশেও অতিরিক্ত গরমে সিংহ মারা গেছে।
ভারতের গুজরাট রাজ্যের একটি অভয়ারণ্যে আটটি এশীয় সিংহের শাবক মারা গেছে। জুনে কর্মকর্তারা জানান, অতিরিক্ত গরমেই শাবকগুলোর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, কোনো সংক্রমণের কারণে তারা মারা গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪২.৫ ডিগ্রি
পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। দক্ষিণ কোরিয়া ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইয়াংসান শহরে রোববার তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ১২২ বছরের আবহাওয়া রেকর্ডে এটিই দক্ষিণ কোরিয়ায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
সোমবার দেশটির আবহাওয়া সংস্থা সিউল ও পার্শ্ববর্তী গিয়ংগি প্রদেশের কিছু এলাকায় সর্বোচ্চ মাত্রার তাপ সতর্কতা জারি করে। জুনে নতুন সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর পর এই প্রথম ওই মাত্রার সতর্কতা জারি করা হলো।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকাতেও একই মাত্রার সতর্কতা বহাল ছিল।
রাত নামলেও গরম থেকে স্বস্তি মিলছে না। চলতি সপ্তাহের বড় একটি অংশজুড়ে রাতের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ধরনের রাতকে ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ বলা হয়।
তীব্র গরমে দক্ষিণ কোরিয়ায় গবাদিপশু ও অন্যান্য প্রাণীরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৯৩ হাজারের বেশি প্রাণী মারা গেছে। এর মধ্যে শূকর, হাঁস-মুরগি ও মাছ রয়েছে।
একই সময়ে ২ হাজারের বেশি মানুষ গরমজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন অন্তত ১৬ জন।
শক্তিশালী হচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’
পূর্ব এশিয়ার এই তীব্র তাপপ্রবাহের সময়েই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ‘সুপার এল নিনো’ শক্তিশালী হচ্ছে। এটি একটি পর্যায়ক্রমিক আবহাওয়া চক্র।
ধারণা করা হচ্ছে, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছে, এই পরিস্থিতি আগামী কয়েক মাসে দ্রুত শক্তিশালী হতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বড় একটি অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা বাড়বে।
এতে সমুদ্রের তাপমাত্রাও বাড়তে পারে। সমুদ্রের বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে কোনো কোনো অঞ্চলে বন্যা, আবার কোথাও খরা দেখা দিতে পারে। তীব্র তাপপ্রবাহসহ আরও নানা ধরনের ক্ষতিকর আবহাওয়ার ঘটনাও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, জাপানের চিড়িয়াখানায় তিন সিংহের মৃত্যু শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পূর্ব এশিয়াজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষ ও প্রাণী—উভয়ের জন্যই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। আর প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হতে থাকা ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে।
সুত্র: সিএনএন