বান্দরবানের পাহাড়ে হামের প্রাদুর্ভাব এখন শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে রুমা, থানচি, আলীকদম ও লামাসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় একের পর এক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক শিশু প্রাণ হারিয়েছে, আবার অনেকেই এখনও হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চিকিৎসাধীন। একই পরিবারের একাধিক শিশুও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
এমন পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য জেলা পরিষদের ন্যস্ত বান্দরবান স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনা, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, চিকিৎসক ও নার্স সংকট, চিকিৎসা উপকরণের অপ্রতুলতা এবং হামে আক্রান্ত রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিতে সোমবার (৩ আগস্ট) সকাল ১০টায় বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে বান্দরবান পার্বত্য জেলার ছাত্র-জনতা।
মানববন্ধনে মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, খুমীসহ বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এছাড়া পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং একজন মানবাধিকার কর্মী বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা অভিযোগ করেন, চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল মাস থেকেই পাহাড়ের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। সময়মতো টিকাদান, সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না বলেও তারা দাবি করেন।
বক্তারা বলেন, বর্তমানে বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশু ভর্তি হচ্ছে। অনেক পরিবারে একজন নয়, দুইজন, তিনজন—এমনকি পরিবারের সব শিশুই হামে আক্রান্ত। সন্তানদের জীবন বাঁচাতে অসহায় বাবা-মায়েরা দিনের পর দিন হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় অবস্থান করছেন।
তারা আরও বলেন, বছরের এই সময়টি পাহাড়ি মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখন জুম চাষের মৌসুম। এই সময়ের পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে সারা বছরের খাদ্য, আয় ও জীবিকা। কিন্তু অসংখ্য পরিবার সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে অবস্থান করায় জুমের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে একদিকে চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তা—দুই সংকটেই পড়েছেন পাহাড়ি মানুষ।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই সম্প্রতি বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের উদ্দেশে “এত ঘন ঘন বাচ্চা নেন কেন?”—এমন মন্তব্য করেন। তাদের ভাষ্য, যখন একজন মা সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য হাসপাতালের বেডের পাশে দিন-রাত কাটাচ্ছেন, তখন একজন জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যখাতের দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে এমন মন্তব্য অত্যন্ত অসংবেদনশীল এবং দুঃখজনক।
এছাড়া বক্তারা অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্যখাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ডা. সানাই প্রু ত্রিপুরা জেলার হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কেও অবগত নন। তাদের মতে, এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতারই প্রতিফলন।
মানববন্ধনে আরও অভিযোগ করা হয়, বান্দরবান সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২৩ থেকে ২৪ জন হাম রোগী চিকিৎসাধীন থাকলেও চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় বরাদ্দ অপ্রতুল। দুর্গম এলাকা থেকে রোগী আনার জন্য পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেক রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছেন না বলেও দাবি করেন বক্তারা।
মানববন্ধন শেষে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে নিম্নোক্ত দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়—
১. জেলার প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
২. স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ও চিকিৎসা বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে।
৩. হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তাদের সঙ্গে থাকা অভিভাবকদের জন্য খাবার, যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, পাহাড়ের মানুষও বাংলাদেশের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। দুর্গম অঞ্চলে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর মৃত্যু যেন আর অবহেলা, চিকিৎসা সংকট বা প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে না হয়। তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান।