Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বিবেকবার্তা

প্রচ্ছদ / অর্থনীতি
১০:৪৯ অপরাহ্ণ, ২৫ জুলাই ২০২৬

গভীর সংকটে দেশের ই-কমার্স খাত, দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার ঝুঁকি

গভীর সংকটে দেশের ই-কমার্স খাত, দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার ঝুঁকি
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

দেশের ই-কমার্স খাত এখন গভীর সংকটের মুখে। ক্রমাগত ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া প্রতিষ্ঠান, গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট, বিনিয়োগ কমে যাওয়া, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং কঠোর প্রতিযোগিতার কারণে খাতটির প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে। এক সময় দ্রুত বিকাশমান এই খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের আগ্রহেও ভাটা পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং কোম্পানিগুলোর প্রতারণার ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব এখনো বাজারে রয়ে গেছে। এ কারণে বাজার সংকুচিত হয়ে আসায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই, কার্যক্রম সীমিত করা বা সম্পূর্ণভাবে ব্যবসা বন্ধ করার পথে হাঁটছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর নীতি সহায়তা, স্বচ্ছ লেনদেন ব্যবস্থা, গ্রাহক সুরক্ষা জোরদার এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে এ খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। অন্যথায় দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় এই শিল্প দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার ঝুঁকিতে পড়বে।

গত কয়েক মাসে দেশের শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজসহ কয়েকটি প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম সংকোচন এবং ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়ে ডেলিভারি হাব বন্ধের খবর পাওয়া গেছে। এতে সাধারণ ক্রেতা, মার্চেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বেশ কয়েকটি কারণে এই খাত আজ সংকটের মুখোমুখি বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে ডলারের উচ্চমূল্য এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পণ্য ডেলিভারি ও লজিস্টিক খরচ বহুগুণ বেড়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের বিলাসপণ্য বা শৌখিন পণ্য কেনাকাটার প্রবণতা কমেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ই-কমার্স খাতে বিনিয়োগ কমে আসায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার ভিড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে। ডিজিটাল প্রতারণা ও গ্রাহকের আস্থাহীনতাও এর পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।

চীনা জায়ান্ট আলীবাবা গ্রুপের অধিভুক্ত হওয়া ‘দারাজ’ ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। করোনা মহামারির সময় দেশজুড়ে একচেটিয়া ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যবসায় ভালো অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি ক্রমেই দাম্ভিক হয়ে ওঠে। এক সময় মার্চেন্ট ও গ্রাহকদের সঙ্গেও এটি প্রদর্শন করতে থাকে কোম্পানিটি। এতে করে ধীরে ধীরে কমতে থাকে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের আস্থা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্চেন্ট বলেন, বর্তমান এই নাজুক পরিস্থিতির জন্য দায়ী দারাজের কর্মকর্তারাই। মার্চেন্ট ও গ্রাহকদের আস্থা হারানোর কারণেই ক্রমেই গুটিয়ে নিতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আগামী দিনে প্রতিষ্ঠানটি আর টিকতে পারবে না বলে জানান তিনি। তার মতে, ২০২০ সালের পর অনেক হাব বন্ধ হয়েছে। সম্প্রতি তাদের শতাধিক হাবের মধ্যে ১৬টি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা গত ১৪ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। এটাই প্রমাণ করে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াচ্ছে।

জানা গেছে, ঢাকার চকবাজার-২, পল্টন ও সাভার এবং চট্টগ্রামের নিউমার্কেট হাব বন্ধ করে সেগুলোর বিকল্প নির্ধারণ করা হলেও ঢাকার বাইরে বগুড়া, রংপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, বাগেরহাট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, ফরিদপুর, মৌলভীবাজার ও সিরাজগঞ্জের হাবগুলোর কোনো বিকল্প রাখা হয়নি।

এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে গতকাল রোববার বিকেলে দারাজ বিডির কাস্টমার কেয়ার সেন্টারে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা লোকমান এ প্রসঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

দারাজের অভ্যন্তরীণ একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে, মূল প্রতিষ্ঠান আলীবাবা গ্রুপ এখন ই-কমার্সের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। ফলে দারাজকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে আলীবাবা আর বিনিয়োগ বাড়াবে না এবং জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের মধ্যে ‘ব্রেক ইভেন’ (আয়-ব্যয় সমান) অবস্থায় পৌঁছাতে না পারলে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হবে না। বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণে পরিচালন ব্যয়ের অংশ মেটানো হচ্ছে। সংকট কাটাতে বনানীর প্রধান কার্যালয়ের চারটি ফ্লোরের মধ্যে দুটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এক হাজার কর্মীর মধ্যে বর্তমানে নিয়মিত কর্মী মাত্র ৩০০ জন, বাকিরা আউটসোর্সিং বা চুক্তিভিত্তিক।

জানা যায়, মার্চেন্টদের বকেয়া অর্থ সময়মতো পরিশোধ না করায় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষের কারণে ডেলিভারি কর্মীরা কর্মবিরতিও পালন করেছেন।

শুধু দারাজ নয়, এরকম আরো অনেক প্রতিষ্ঠান এখন লোকসানের মুখে পড়ে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে।

ভাস্কর্যের সিংহ এবং সিংহচর্মের রাজনীতিভাস্কর্যের-সিংহ-এবং-সিংহচর্মের-রাজনীতি
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি লোভনীয় ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ হারে ক্যাশব্যাক অফার দিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে। যার দায়ে এর প্রতিষ্ঠাতা রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমাকে আদালত দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি কোনো অগ্রিম ডেলিভারি চার্জ ছাড়া শতভাগ ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধায় পুনরায় কার্যক্রম শুরু করলেও তা বাজারে তেমন সাড়া পাচ্ছে না। গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকার পরিশোধেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দেশের ৩২টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রাহকের পাওনা ৫৩১ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠান এখনো টাকা ফেরত দেয়নি। এছাড়া দেশের ৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৬৬১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের তথ্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে, যার মধ্যে আনন্দের বাজার (৩০০ কোটি), ই-অরেঞ্জ (২৩২ কোটি) ও ধামাকা (১১৬ কোটি) অন্যতম।

বর্তমানে দেশে তিন লাখেরও বেশি ই ও এফ (ফেসবুক) কমার্স প্রতিষ্ঠান থাকলেও নিবন্ধিত মাত্র এক হাজার ৪৯৬টি। বাকি প্রায় দুই লাখ ৯৮ হাজার অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান অবৈধ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন করছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।

এদিকে, দারাজের হাব বন্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। ই-ক্যাবের এক নেতা জানান, বড় প্রতিষ্ঠান হাব গুটিয়ে নিলে সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রান্তিক বিক্রেতাদের ওপর। দারাজের এক ফ্যাশন মার্চেন্ট জানান, স্থানীয় হাব বন্ধ হওয়ায় পণ্য ডেলিভারিতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে, যা ভোক্তাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তবে সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকৌশলী আব্দুল আজিজের মতে, বাংলাদেশের ই-কমার্স এখন আর শুধু অনলাইন শপিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়, এটি পাঁচ লাখেরও বেশি এসএমই, ফ্রিল্যান্সার ও নারী উদ্যোক্তার কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি। বর্তমানে দেশে ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসারের ফলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার ১.৫ ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হতে পারে।

ভোক্তা অধিকার বিশ্লেষক ও ক্যাবের সহ-সভাপতি নাজের হোসাইন জানান, প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন ব্যবসার প্রসারের চেয়ে টেকসই হওয়ার দিকে নজর দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের মতে, এই সংকট কাটাতে ই-কমার্স খাতের জন্য নীতিগত সহায়তা ও সহজ ঋণ, অনলাইন কেনাকাটায় মনিটরিং জোরদার এবং লজিস্টিক খরচ কমাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

Facebook Comments Box
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
Advertise with us
আরও বিবেকবার্তা সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com

শিরোনাম