বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না ফেসবুক-ইউটিউব
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘ক্রস–বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি (DBID) নিবন্ধন ছাড়া মেটা, গুগল ও ইউটিউবের মতো বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশে আর বিজ্ঞাপন বা সেবা প্রচার করতে পারবে না।
অনলাইন বাণিজ্যে শৃঙ্খলা আনা, রাজস্ব বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই খসড়ার ওপর অংশীজনেরা আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত মতামত দিতে পারবেন।
নীতিমালার মূল নির্দেশনাসমূহ
বাধ্যতামূলক নিবন্ধন: বাংলাদেশে পণ্য, সেবা বা বিজ্ঞাপন পরিচালনা করতে যেকোনো বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানকে আগে ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন নিতে হবে।
কর ও আইনি বিধান পালন: বিজ্ঞাপন প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রচলিত ভ্যাট-করসহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সকল বিধিবিধান মেনে চলতে হবে।
সামাজিক মাধ্যম ও ওটিটি নিয়ন্ত্রণ: নিবন্ধনের পর দেশে পণ্য আমদানি করা হলে তার বিজ্ঞাপন অনলাইনে প্রচার করা যাবে, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন সংশ্লিষ্ট নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হতে হবে।
কেন এই নীতিমালা?
বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানান, দেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
সরকারের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:
স্বচ্ছতা ও রাজস্ব বৃদ্ধি: সুনির্দিষ্ট নিবন্ধনের মাধ্যমে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন খাতের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখা ও রাজস্ব নিশ্চিত করা।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন: ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (SME) উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে অর্জিত রপ্তানি আয়ে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পথ তৈরি করা।
পার্সেলভিত্তিক সুবিধা: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশ্ববাজারে পণ্য পাঠাতে পার্সেলভিত্তিক রপ্তানি নীতি ও বিমা সুবিধা চালুর পরিকল্পনা।
নিষিদ্ধ পণ্যের বিজ্ঞাপনে কড়াকড়ি
খসড়া নীতিমালায় ভোক্তা অধিকার রক্ষা ও অনলাইন জালিয়াতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে:
যেকোনো ধরনের নকল, ভেজাল, প্রতারণামূলক পণ্য বা সেবা প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
অনলাইন জুয়া, লটারি, বেটিং এবং দেশের প্রচলিত নীতিমালায় নিষিদ্ধ পণ্য ও সেবার অনলাইন বাণিজ্য ও বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হবে।
ভোক্তা বিভ্রান্ত করে বা অনলাইন বাজারব্যবস্থার শৃঙ্খলা নষ্ট করে—এমন বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না।
মূল্য পরিশোধ ও ভোক্তা সুরক্ষা ব্যবস্থা
গ্লোবাল পেমেন্ট ও এসক্রো সেবা: আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সাথে দেশীয় অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার সংযোগ বাড়ানো এবং অনলাইন লেনদেনে ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তা দিতে ‘ক্রস-বর্ডার এসক্রো (Escrow)’ সেবা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
পণ্য ফেরত ও রিফান্ড নীতি: অনলাইনে কেনা পণ্য বর্ণনার সাথে না মিললে, নকল বা ত্রুটিপূর্ণ হলে বিক্রেতাকে তা ফেরত নিয়ে সম্পূর্ণ টাকা রিফান্ড করতে হবে।
বিরোধ নিষ্পত্তি: আন্তর্জাতিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে অলটারনেটিভ ডিসপিউট রেজোল্যুশন (ADR) ব্যবস্থা গঠন এবং ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক করা হবে।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার ও বিশেষজ্ঞদের মত
আয়ারল্যান্ডভিত্তিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটস-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজারের আকার ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিজ্ঞাপনী সংস্থা মিডিয়াকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অজয় কুমার কুন্ডু সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “নিবন্ধন না থাকায় বিজ্ঞাপনের পুরো হিসাব সরকারের কাছে ছিল না। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি পুরো খাতটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আসবে।”