একসময় সবুজ প্রকৃতি আর জালের মতো বিস্তৃত খাল-দিঘি মিলিয়ে যে বরিশাল শহরে ছিল এক অপার্থিব আবহ, আজ তা শুধুই স্মৃতি। একের পর এক খাল বেদখল, দূষণ আর পুকুর ভরাটের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই নদীমাতৃক শহরটি এখন রূপ নিচ্ছে এক তপ্ত কংক্রিটের জঙ্গলে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর প্রশাসনের উদাসীনতায় বরিশালের বর্তমান দশা যেন ঠিক রাজধানী ঢাকার মতোই—একটু বৃষ্টি হলেই ডুবছে রাস্তাঘাট, নামছে না পানি।
বরিশাল পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের ইতিহাস ১৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো। অথচ ৫৮ বর্গকিলোমিটারের এই শহরে একসময়কার সচল ২৪টি খালের মধ্যে এখন মাত্র ৪টি খালে (সাগরদী, জেল, আমানতগঞ্জ ও মোহাম্মদপুর) কোনোমতে পানিপ্রবাহ টিকে আছে। বাকিগুলোর মধ্যে ৭টির কোনো অস্তিত্বই নেই এবং ১৩টি প্রায় মৃত।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‘নবগ্রাম খাল’-এর কথা। ঝালকাঠির কালিজিরা নদী থেকে কীর্তনখোলা পর্যন্ত বিস্তৃত এই খালে একসময় কৃষকেরা ডিঙিনৌকায় সবজি নিয়ে আসতেন। ২০০২ সালে সড়ক চওড়া করার নামে খালটি ভরাট করে তৈরি হয় ‘এম এ জলিল সড়ক’। ফলশ্রুতিতে, এখন সামান্য বৃষ্টিতেই এই সড়কে সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা।
এমনকি মূল শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী ‘জেল খাল’-এর অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। বাজার ও মৎস্য আড়তের বর্জ্য ফেলে এবং দুই পাড়ে আরসিসি পিলার দিয়ে বহুতল ভবন তুলে খালটিকে গলাটিপে হত্যা করা হচ্ছে। একই চিত্র নাপিতখালী, ভাটার, চাঁদমারী ও কাশীপুরসহ প্রায় ১৬টি খালের, যেগুলো এখন মানচিত্র থেকে বিলীন হওয়ার পথে।
“একটি জীবন্ত খালকে এভাবে চোখের সামনে মরে যেতে দেখে নিজেকে অপরাধী লাগে। এই উদাসীনতা চলতে থাকলে বরিশাল অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।”
— ক্ষুব্ধ নগরবাসী ও পরিবেশ আন্দোলন কর্মীরা।
খালের পাশাপাশি বিলুপ্ত হচ্ছে বরিশালের ফুসফুসখ্যাত পুকুর ও দিঘিগুলো। ২০১১ সালের সরকারি মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী শহরে ৪৩৬টি সরকারি পুকুর ছিল, যা বর্তমানে অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর যৌথ জরিপ বলছে, নগরের প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুরের প্রায় সবকটিই ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন।
এমনকি খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও জলাশয় ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পুলিশ লাইনস, হাসপাতাল রোড এবং অতি সম্প্রতি রূপাতলী হাউজিং এস্টেটের পাশে জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন শতবর্ষী ‘লালার দিঘি’ বালু দিয়ে ভরাট করে প্লট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাল ও জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় নগরের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকায় এখন দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা কীর্তনখোলার জোয়ারের পানিতে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এর চেয়েও বড় সংকট তৈরি হয়েছে সুপেয় পানির। একসময় মানুষ পুকুর ও খালের পানির ওপর নির্ভর করলেও এখন তা ব্যবহারের অনুপযোগী।
নগরে প্রতিদিন পানির চাহিদা ৫ কোটি ২৬ লাখ লিটার হলেও সিটি করপোরেশন ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ২ কোটি ৪০ লাখ লিটার। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে নগরজুড়ে বসানো হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার গভীর নলকূপ। ফলে আশঙ্কাজনক হারে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। দুই দশক আগেও যেখানে ৮০০ ফুটের মধ্যে সুপেয় পানি মিলত, এখন ৯৫০ ফুটের নিচে না গেলে পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
সম্প্রতি বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ঢাকার অবস্থান তলানির দিকে (যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্ক ও ত্রিপোলির ঠিক পরেই)। বরিশালও আজ দ্রুত সেই একই আত্মঘাতী পথের যাত্রী। ২০১১ সালে বরিশালকে পরিবেশবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলতে ২০৩০ সাল মেয়াদি একটি মহাপরিকল্পনা নেওয়া হলেও, সময়সীমার শেষভাগে এসেও তার অগ্রগতি হতাশাজনক।
পরিবেশবিদদের মতে, বরিশালের যেটুকু প্রকৃতি এখনো অবশিষ্ট আছে, তা বাঁচানোর এটাই শেষ সুযোগ। এখনই যদি অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে খাল ও জলাশয়গুলো উদ্ধার করা না হয়, তবে চিরতরে হারিয়ে যাবে ‘ধান-নদী-খাল’ এর এই রূপসী বরিশাল।