Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বিবেকবার্তা

প্রচ্ছদ / শিক্ষা
৯:৩৭ অপরাহ্ণ, ৫ জুন ২০২৬

জনম জিরাতি সুখ

জনম জিরাতি সুখ
নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ মিনিটে পড়ুন |

রাজীব কুমার দাশ

এই জনপদে চিন্তার ইতিহাস মানচিত্র ভূগোল বাদেও— অথৈ চিন্তার মানুষ নিয়ে যতটুকু জানা যায়, এই জনপদে জনপথের মানুষ বারোমাসি সবজির মতো— মনেরও নানান রকমের রং ঢং সঙ চিন্তার ফসন তুলে ভালো থাকেন। যা দেখে মনে হয়,এই জনপদে মানুষ মাত্রই বানরের বিবর্তিত প্রজাতি। এই জনপদে মানুষের সামনে এটা ওটা করে নতুন কিছু দেখাতে নাই।

সাপুড়ে হাতে সাপ যেমন করে পোষ মানে না, তেমন করে এই জনপদে মানুষও পোষ মানে না। ছোট বাবুদের মোবাইল দেখাতে গিয়ে এক একজন বাবু যেমন করে— পড়ালেখা বাদে হয়ে গেছেন এক একজন মোবাইল খোর টিকটকার, অনলাইন বিশেষজ্ঞ ফ্রি ফায়ার শুটার। অনলাইন জুয়াখোর। তারা রাতারাতি হতে পেতে চান, অনলাইন লাভার। তারা শেখার চেয়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা মামলা করতে ধুরন্ধর আগ্রাসী।

শিক্ষকের শিশ্ন যোনিতে একচেটিয়া রাখতে চায় তাদের বাপ দাদার পৈত্রিক অধিকার। হতে চায়— অমুক তমুক নেতা, পাতি নেতা জজ ব্যারিস্টারের সন্তান। এককভাবে হতে চান,কোনো দলের সেরা ছাত্র মাস্তান।

সোনামণি বাবুদের মোবাইল ছাড়া একদমই চলে না। তারা মোবাইল দেখে মা’র দুধ পান করেন। সকাল দুপুর রাতের খাবার সেরে নেন। মোবাইল দেখিয়ে তাদের পটি ট্রেনিং করাতে বাধ্য হন। এই জনপদে মানুষ যে, জন্মগতভাবে অপরাধী তা কথিত নিষ্পাপ শিশুদের দেখে— যে কেউ বিশ্বাস করতে বাধ্য হন।

পিঠাপিঠি ভাইবোন হলে, সুযোগ বুঝে ছোট বাবুটাকে নামিয়ে বড় বাবুটা মা কোলে স্নেহের সিংহাসন দখল করে নেন। সেরেফ কিছু সময় বসার প্রয়োজনে কথিত নিষ্পাপ নিরপরাধ কণ্ঠে মা’কে যে পরিমাণে তোষামুদে সাহিত্য উপহার দেন,তা এই জনপদে সবারই জানা।

রাতে বাবা মা’র এক বিছানায় ঘুমের ভান ধরে থেকে, দুষ্টু ছোট্ট সোনামণিরা সঙ্গম দৃশ্য দেখে, নিজেদের মাঝে যে পরিমাণ অশ্লীল ভাষায়, যৌন সুড়সুড়ির গল্প কথাবার্তা বলে থাকেন, তাও কারোর কাছে তেমন একটা অজানা নয়।

সাপের বাচ্চা যেমন, বিষ মুখে জন্মায়, তেমনি এই জনপদে মানুষের বাচ্চারাও জন্মগতভাবে নানানরকম অপরাধী মন নিয়ে জন্মায়। অপরাধ বিজ্ঞানের মুখে ছাই মেখে এটুকু বলা যায়, এতটুকু স্নেহ সুখের জন্য শিশুরা নানান রকমের জবুথবু অবস্থা হতে বছর তিন চারেকে এসে তাদের ছোট বড় ভাইবোন নিয়ে নানাভাবে বিশ্রী মন্তব্য করে বেড়ান। একে অপরের বিষোদগার করে ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট দলের মতো করে মা কোলোই সেরাটা খেলে ট্রফি জিতে নেন।

আগেই বলেছি, এই জনপদের মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধী। বাজে রকমের অপরাধী মন। ছলাকলা বলা চলা কূট কৌশলে — কূট সাহিত্য তাদের বাবা মা কোলোই রপ্ত করে নেন। তারা হন, ভীষণ রকমের করে বাক্য অমিতব্যয়ী। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন; হোক না সেটা দান প্রতিদান শ্রদ্ধা সম্মান আবেগ কিংবা অনুরাগ বিরাগ এটা ওটা সেটা; যেকোনো পরিস্থিতিতে সুযোগ পেলে ভীষণ রকমের খরুচে হিশেবে নিজেদের জানান দেন। বিশেষ করে গালাগালিতেও প্রচুর পরিমাণ খরুচে। বাংলা হিন্দি সিনেমায় নাই এমন রকমের করে খুনোখুনি গালি সাহিত্যে নিজেদের জানান দেন।

এই জনপথ জনপদে মনোপথ হৃদয় পথ পেরিয়ে জনগণের — আপদে বিপদে যাকে দেখেছিলাম জেনেছিলাম, মোটের ওপর ভালো; জাতীয় জীবনে এসে দেখি— সেও ভালো রকমের ছিল না কোনোদিন কোনোটা কোনোকিছু। স্বাধীনতার সাংখ্যিক সহগ পাকাপোক্ত পতাকা জীবনে নানান রকমের করে যাদের দেখেছি কিংবা দেখেছেন, তাদের কেউ কেউ থেকেছেন, ‘গুপ্ত লোপাট প্রহরী’।

সত্যি সত্যি তিনসত্যি দেশ মাতৃকার প্রহরী ছিল, হাতেগোনাদের মধ্যে তাও জানি ক’জন! থেকেছেন ফাইলে বন্দি গোপন ও সীমিত।

মানুষ বানরের বিবর্তিত প্রজাতি বলে মানুষই জানেন স্বয়ং। বানরের মতো করে মানুষকেও লাই দিতে নাই। হোক না, সেজনা প্রতিবেশি ভিনদেশি বাবা মা ভাই বোন বন্ধু স্ত্রী পুত্র স্বজন। লাই পেলে মাথায় উঠে প্রস্রাব করে দেবেন এমনটাই চিরসত্য স্বয়ং।

পুলিশ লাইনে শত হাজার পুলিশ ব্যারাকে যে যারা থাকেন; তা‌দের অনেক কষ্টকর বিষয়েও তারা সহজতর সমাধান নিজে থেকেই করে নেন। আর আই, হাবিলদার মেজর, ফোর্স সুবেদার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রেখে চাকরি শেষ করে নীরবে বাড়ি চলে যান। নেই তাদের বাড়ি গাড়ি এসি তুলতুলে নরম বিছানা। তাদের কাছে নেই, সন্তানের নিত্য নতুন সুখ আবদার। নাই বিদেশে সন্তান পাঠিয়ে সন্তানের মাধ্যমে নিজেদের দেশ লুটের তথ্য উপাত্ত ও টাকা পাচার। নাই, বউ শালী মা বাবার নিত্য নতুন কিছু চাই চাই, হাহাকার।

তাদের কাছে নেই,গাড়ি অফিস বাসায় এসি। তবুও তাদের নিজেদের কাছে অপূর্ণতার হাহাকার কিংবা জৈবিক হাপিত্যেশ নেই। তাদের কাছে ছুটি বেতন জীবনই অর্থপূর্ণ ও অনেক মর্যাদার।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে ফোর্সের ছুটি ও বেতন নিয়ে সংরক্ষণ অফিসার বনে বছর তিনেক কাজ করেছি। আহা! তাদের কাছে ছুটি বেতন মানেই ঈদ।

ছুটি মঞ্জুর হবার পরে তাদের চোখেমুখে লেপ্টে থাকত, ঈদ পূজা পার্বণের সুখ।

থানায় থাকতে প্রতিসপ্তাহে রুটিন মতে অফিসারের কারোর না কারোর জেল প্যারেডে যেতে হতো। আমিও যেতাম। সারি সারি করে দাঁড়িয়ে থাকা অপরাধীদের মনিটর করতাম।

দেখতাম, বন্দিদের নিরীহ চোখগুলো কী যেন কিছু বলতে চাইছে। ভাবতাম আহা! ভেতরে না এসে যদি এই চোখে তোমরা বাইরে থেকে যেতে; ভাই বাবা বাছাধন বৎস! কার সাধ্য ছিল এমন জেলবন্দি করবে তোমাদের জীবন।

পুলিশের সামনে দু’চার কথা বললেও জেলার কিংবা ডেপুটি জেলার কারারক্ষীদের সামনে ভয়ংকর রকমের ডাকাত খুনিদের দেখতাম, একেবারে ছোট্ট আবাল শিশু। পুলিশের কাছে ভয়ংকর রকমের অপরাধীরা ধরা পড়ার পরে, তারা পালিয়ে যেতে সর্বোচ্চ রকমের ধ্বস্তাধস্তি করেন। কিল-ঘুষি মেরে কিংবা ছোরা বসিয়ে দিয়ে পালানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তাদের মাঝে কেউ কেউ বন্দুকবাজ হলে আবার পুলিশকে গুলি করে দেন।

কেউ আবার পুলিশকে সর্বোচ্চ রকমের ডর ভয় দেখান। জেলে গেলে এইসব ভয়ংকর রকমের অপরাধীরা জেলখানার শৃঙ্খলা মেনে আলু ভাজি রুটি গুড় ঝোল মাখা ভাতেও অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।

কারাগারে গরমের প্রথম দিনের ইলিশ ফাইলের কথা মনে করে, বার বার এমন জীবনে অনেকটা শান্তি ও মহান মেনে কারাগারে বন্দিজীবন কাটিয়ে দেন।

এই জনপদের ইতিহাসে— মানুষ মানেই ত্যান্দড় বানর স্বভাবের।

বানরের মতো করে তাদের লাঠি দেখিয়ে রাখতে হয়। সাজা দিতে হয়,খাওয়াতে হয়। তাদের সুযোগ সুবিধা শান্তি বেশি হলে তারা

বানরের মতো করে, যার তার পরিধেয় কাপড় চোপড় ধরে টানাটানি করেন। পেট ভরে গেলে, সুযোগ পেলে বেড়াল কুকুরের ঘাড়ে চেপে ধরে কানমলা দেন, কখনওবা তাদের পশ্চাৎদেশে খামচি মেরে নিজের আরামের সর্বনাশ ডেকে আনেন।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আর আই সাহেব— দিনে কয়েকবার হাবিলদার মেজর,ফোর্স সুবেদার ফেটিগ হাবিলদার, এলসি’দের ডেকে এনে রোল কলে অপেক্ষায় রাখেন। ত্যক্তবিরক্ত হবার পরে তাদের জন্য এটা ওটা সেটা নানান আদেশ জারি করেন। তার মানে হলো সবাইকে বিজি রাখা। তারা বিজি থাকলে ফোর্সরাও এদিকে ওদিকে ঘুরাঘুরি কিংবা দুষ্টু চিন্তা করতে পারবে কম।

মানুষকে অলস বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাখতে নেই। হিটলার মুসোলিনী তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রাষ্ট্র মানুষকে বাঁচায় না মানুষই বাঁচায় রাষ্ট্র? এমন প্রশ্নে হতচকিত হবে রাষ্ট্রের জনগণ। যার যে কাজ সে কাজেই তাকে লাগিয়ে রাখতে হবে, শাসন সোহাগে হবে বানরের মতন।

রাষ্ট্র বনাম জনগণ নির্ভর সব রাষ্ট্রের মানুষ বানর রাষ্ট্রের সংবিধান ঠিক রাখতে পারলেও এই উপমহাদেশীয় দুই-একটা রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় বড় গুহ্য পাকা বানর ঠিক রাখতে রাষ্ট্রে কার কাজ হবেটা কী?

রাষ্ট্রের সংবিধান মানবাধিকার জাতিসংঘ না মানা গুহ্যদেশ পাকা বানর মানবকে জেলখানার মতো করে ঠিক রাখতে, পুলিশ লাইনসের হাবিলদার মেজর, আর আই, ফোর্স সুবেদার, এলসি (মুন্সী) হতে কবে— জনম জিরাতি সুখ জানি না কবে কেউ শিখবেন?

লেখক : কথাসাহিত্যিক

Facebook Comments Box
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
Advertise with us
আরও বিবেকবার্তা সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com

শিরোনাম