বান্দরবানের থানচি উপজেলার বলিপাড়া ইউনিয়নের বলিপাড়া বাজারে আবারও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। ভোররাতের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ১৩টি দোকানপাট। তিলে তিলে গড়ে তোলা ব্যবসা, বছরের পর বছর সঞ্চয় করে কেনা মালামাল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র—কিছুই রক্ষা করতে পারেননি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। এক রাতেই শেষ হয়ে গেছে তাদের বহু বছরের পরিশ্রম ও জীবিকার অবলম্বন।
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোররাত আনুমানিক ৩টার দিকে বাজারে আগুনের সূত্রপাত হয়। সে সময় অধিকাংশ ব্যবসায়ী নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। কারণ তারা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে ব্যবসা পরিচালনা করে রাতে বাজারে না থেকে বাড়িতে ফিরে যান। ফলে গভীর রাতে আগুন লাগার খবর পাওয়ার আগেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে একাধিক দোকানে।
আগুনের ভয়াবহতায় দোকানগুলোর মালামাল, আসবাবপত্র, ব্যবসায়িক কাগজপত্র ও নগদ অর্থসহ সবকিছু পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সবচেয়ে বড় কষ্ট শুধু দোকান হারানো নয়—হারিয়ে গেছে তাদের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। কেউ হয়তো সন্তানের পড়াশোনার জন্য টাকা জমিয়েছিলেন, কেউ নতুন করে ব্যবসা বাড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন; কিন্তু কয়েক ঘণ্টার আগুনে সবকিছু পরিণত হয়েছে ছাইয়ে।
বলিপাড়া বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২২ মার্চ ২০২৩ ভোরে ভয়াবহ আগুনে বাজারের অর্ধশতাধিক দোকান পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সে ঘটনায় ৫৩টি দোকানঘর পুড়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এরপর ২৫ অক্টোবর ২০২৫ গভীর রাতে আবারও আগুন লাগে বলিপাড়া বাজারে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওই ঘটনায় ১১ থেকে ১৩টি দোকান পুড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। ফায়ার সার্ভিস জানায়, রাত সোয়া ২টার দিকে খবর পেয়ে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। আগুনের কারণ হিসেবে তখন বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
আর এবার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬—ভোররাত ৩টার দিকে আবারও আগুন। পুড়ে গেল ১৩টি দোকানপাট।
পরপর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে গভীর রাতে বাজারে আগুন লাগার ঘটনাগুলোর প্রকৃত কারণ কী—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে আগুনের কারণ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
একটি দোকান মানে শুধু কয়েকটি টিনের বেড়া, কাঠের কাঠামো আর কিছু পণ্য নয়। একটি দোকানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসার খরচ, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং একজন মানুষের বছরের পর বছর ঘাম ঝরানো শ্রম।
আজ সেই দোকানগুলোর জায়গায় পড়ে আছে পোড়া টিন, ছাই আর ধ্বংসাবশেষ।
আগুন হয়তো কয়েক ঘণ্টায় সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু এই ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে আছে বহু পরিবারের বছরের পর বছর ধরে লালন করা স্বপ্ন।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দ্রুত তালিকা প্রণয়ন করে সরকারি ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সুষ্ঠু তদন্ত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে বাজারের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এখন জরুরি।