বান্দরবানের নীলগিরি-সংলগ্ন কাপ্রু পাড়ায় এক জুম্ম দোকানদার কর্তৃক এক গাড়িচালককে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘পাহাড়ি সন্ত্রাসী’ ও ‘চাঁদাবাজি’র অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটির সঙ্গে চাঁদাবাজির কোনো সম্পর্ক নেই; বরং গাড়ি সাইড করতে গিয়ে দোকানের টিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ক্ষতিপূরণ দাবি এবং পরবর্তী তর্কাতর্কি থেকেই ঘটনার সূত্রপাত।
সম্প্রতি মোস্তাক হেলাল নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক পোস্ট ও ভিডিওতে ঘটনাটিকে একজন ‘পাহাড়ি সন্ত্রাসী’র চাঁদা দাবির ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পোস্টে দাবি করা হয়, চাঁদা না দেওয়ায় তাঁকে ও তাঁর এক গাড়িচালককে মারধর করা হয়েছে এবং একটি দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
তবে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্য এ বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই দোকানদার মেনসুওয়া ম্রো নীলগিরি-সংলগ্ন কাপ্রু পাড়ায় দীর্ঘ প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে দোকান পরিচালনা করে আসছেন। দীর্ঘ এই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনো অভিযোগ স্থানীয়ভাবে শোনা যায়নি বলেও তাঁরা জানান।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার শুরু হয় একটি গাড়ি সাইড করার সময়। গাড়িটি সাইড করতে গিয়ে মেনসুওয়া ম্রোর দোকানের টিন ভেঙে যায়। এতে দোকানের ক্ষয়ক্ষতি হলে তিনি ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০০ টাকা দাবি করেন। স্থানীয়দের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের জন্য ক্ষতিপূরণ চাওয়া এবং কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে জোরপূর্বক ‘চাঁদা’ দাবি করা এক বিষয় নয়। তবে ওই ৫০০ টাকা দেওয়া নিয়ে গাড়িচালকের সঙ্গে দোকানদারের তর্কাতর্কি শুরু হয়।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে মেনসুওয়া ম্রো গাড়িচালককে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মারধরের ঘটনাকে স্থানীয়রাও সমর্থন করছেন না এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে একই সঙ্গে স্থানীয়দের প্রশ্ন, ঘটনার পূর্বাপর না তুলে ধরে শুধু পরবর্তী মারধরের দৃশ্য দেখিয়ে পুরো ঘটনাটিকে ‘চাঁদাবাজি’ এবং ‘পাহাড়ি সন্ত্রাসী’র ঘটনা হিসেবে প্রচার করা কতটা ন্যায্য?
স্থানীয়দের আরও প্রশ্ন, যদি মেনসুওয়া ম্রো সত্যিই দীর্ঘদিনের ‘চাঁদাবাজ’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে প্রায় এক যুগ ধরে প্রধান সড়কের পাশে প্রকাশ্যভাবে দোকান পরিচালনা করে আসছেন? তাঁর বিরুদ্ধে এতদিনের কোনো নির্দিষ্ট চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, মামলা কিংবা প্রমাণ রয়েছে কি না—সেটিও সামনে আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটনার মূল কারণ আড়াল করে মেনসুওয়া ম্রোকে ‘পাহাড়ি সন্ত্রাসী’ ও ‘চাঁদাবাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁদের মতে, এতে শুধু একজন ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাই নয়, বরং পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক ধারণা তৈরির সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে—পাহাড়ি এলাকায় চলাচলের সময় গাড়িচালকদের স্থানীয় মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সম্পদ ও জীবিকার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি হলে তা স্বীকার করে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। একইভাবে ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সেটিও আইনগত ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে সমাধান করা প্রয়োজন; কোনো পক্ষেরই শারীরিক হামলার আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটনে শুধু ভিডিওর একটি অংশ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ওপর নির্ভর না করে ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য, দোকানের ক্ষয়ক্ষতির বিষয় এবং ৫০০ টাকা দাবির প্রকৃত কারণ যাচাই করা জরুরি।
একটি স্থানীয় বিরোধকে ‘চাঁদাবাজি’ বা ‘পাহাড়ি সন্ত্রাসী’র তকমা দিয়ে উপস্থাপন না করে প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনা তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, মারধরের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট আড়াল করে কোনো ব্যক্তিকে ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘চাঁদাবাজ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।