Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বিবেকবার্তা

প্রচ্ছদ / সারাদেশ
২:২৫ পিএম, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন পার্বত্য জেলায় জনসমক্ষে সশস্ত্র টহল: জননিরাপত্তা নাকি জনমনে আতঙ্ক

তিন পার্বত্য জেলায় জনসমক্ষে সশস্ত্র টহল: জননিরাপত্তা নাকি জনমনে আতঙ্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—এই তিন পার্বত্য জেলায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের পথে সামরিক পোশাকে, দৃশ্যমান অস্ত্রসহ সেনাসদস্যদের গাড়িতে নিয়মিত চলাচল এখন অনেকের কাছে যেন স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে দৃশ্যকে ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটি কি সত্যিই একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক নাগরিক জীবনের অংশ হওয়া উচিত?

নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা আমরা অস্বীকার করছি না। কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেই পারে। কিন্তু সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি প্রতিদিন জনসমক্ষে দৃশ্যমান অস্ত্র, যুদ্ধের পোশাক ও সামরিক বহরের মাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্কের অনুভূতি সৃষ্টি করে, তাহলে সেই পদ্ধতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার।

কিন্তু প্রশ্নটা আরও গভীর—পাহাড়ের মানুষকে আসলে কী মনে করা হয়?

পাহাড়ের সাধারণ মানুষ কি অস্ত্র হাতে প্রতিদিন রাস্তায় বের হয়? বাজারে যাওয়া কৃষক, বিদ্যালয়ে যাওয়া শিক্ষার্থী, দোকানে বসা ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ কিংবা সাধারণ পরিবারগুলো কি যুদ্ধ করতে রাস্তায় নামে? তাদের হাতে কি এমন কোনো অস্ত্র রয়েছে, যার মোকাবিলায় প্রতিদিন যুদ্ধের পোশাক পরে বন্দুক তাক করে গাড়িতে করে জনবহুল এলাকায় চলাচল করতে হবে?

যদি সাধারণ পাহাড়ি জনগণ অস্ত্রধারী না হয়, তাহলে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সামনে এমন সামরিকীকৃত পরিবেশ কেন তৈরি হবে?

একজন সাধারণ নাগরিক যখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে তার দিকে অস্ত্র তাক করা অবস্থায় সামরিক সদস্যদের গাড়ি এগিয়ে আসছে, তখন তার মনে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি হবে—নাকি অজানা আশঙ্কা ও আতঙ্ক তৈরি হবে? রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য যদি নাগরিককে নিরাপদ রাখা হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থা নাগরিকের মানসিক নিরাপত্তার বিষয়টিকেও বিবেচনায় নেবে—এটাই স্বাভাবিক।

পাহাড় কি যুদ্ধক্ষেত্র?

পাহাড়ের প্রতিটি মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা, প্রতিটি জনপদকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতির ছাপ তৈরি করা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। বরং এতে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব শুধু অস্ত্র বহন করা নয়; জনগণের আস্থা অর্জন করাও নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন নাগরিক যেন রাষ্ট্রের পোশাকধারী সদস্যকে দেখে ভয় না পেয়ে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার অনুভূতি পান—সেটিই হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য।

পাহাড়ের মানুষ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু আতঙ্কের নিরাপত্তা চায় না।

তারা চায় এমন একটি পরিবেশ, যেখানে নিজের দেশের রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে প্রতিদিন যুদ্ধের আবহ অনুভব করতে হবে না। তারা চায় এমন রাষ্ট্র, যেখানে নিরাপত্তা থাকবে—কিন্তু সেই নিরাপত্তা মানুষের স্বাধীন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ভীত করে তুলবে না।

তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন—তিন পার্বত্য জেলায় জনসমক্ষে প্রতিদিন এভাবে দৃশ্যমান অস্ত্রসহ সামরিক চলাচলের সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা কী? এর উদ্দেশ্য কী? এবং সাধারণ মানুষের মনে এর ফলে যে ভয় ও অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে, তা কি রাষ্ট্র বিবেচনায় নিচ্ছে?

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে জনগণ রাষ্ট্রকে ভয় পেয়ে নয়, রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রেখে বাঁচবে—এটাই হওয়া উচিত প্রত্যাশা।

পাহাড় যুদ্ধক্ষেত্র নয়। পাহাড়ের মানুষও কোনো শত্রুপক্ষ নয়। পাহাড়ের মানুষ এই দেশেরই নাগরিক।

সুতরাং নিরাপত্তার নামে এমন কোনো পরিবেশ তৈরি করা উচিত নয়, যেখানে নিজের দেশের মাটিতেই একজন সাধারণ মানুষ নিজেকে যেন যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে বসবাসকারী মনে করেন।

অস্ত্রের প্রদর্শন নয়—জনগণের আস্থাই হোক নিরাপত্তার প্রকৃত শক্তি।

এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
Advertise with us
আরও বিবেকবার্তা সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com

শিরোনাম