
মানুষের ঘর মানুষ গড়েছে; কিন্তু সেই ঘরে চোর ঢোকানোর পথটি যখন পাহারাদার নিজেই করে দেয়, তখন তাকে গাফিলতি বলা হবে, নাকি বিশ্বাসঘাতকতা-তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকে। শনিবার যুগান্তরে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভান্ডারে থাকা নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য বিক্রির কেলেঙ্কারির রেশ না কাটতেই বেরিয়ে এসেছে আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ […]

মানুষের ঘর মানুষ গড়েছে; কিন্তু সেই ঘরে চোর ঢোকানোর পথটি যখন পাহারাদার নিজেই করে দেয়, তখন তাকে গাফিলতি বলা হবে, নাকি বিশ্বাসঘাতকতা-তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকে। শনিবার যুগান্তরে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভান্ডারে থাকা নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য বিক্রির কেলেঙ্কারির রেশ না কাটতেই বেরিয়ে এসেছে আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানানোর জন্য ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ নামের একটি অ্যাপের ব্যবস্থা করে ইসি। যে অ্যাপটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় একটি বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অ্যাপটি পরিচালনার জন্য নিরাপত্তার স্বার্থে যেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে চার ধরনের তথ্যের এক্সেস দিলেই চলত, সেখানে ইসির সংশ্লিষ্টরা তাদের হাতে তুলে দেয় এনআইডি তথ্যভান্ডারে থাকা নাগরিকদের ছবিসহ ২৮টি ডেমোগ্রাফিক তথ্য। আরও জানা যায়, নাগরিকদের গোপনীয় তথ্যভান্ডারের অ্যাকসেস ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়ার পর ওই আইডি ও এপিআইর মাধ্যমে ইসির তথ্যভান্ডারে অস্বাভাবিক হিট হতে থাকে, যা দেখে টনক নড়ে ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। পরবর্তীকালে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিলেও ক্ষতি যা হওয়ার, তা হয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য ফাঁসের এ ঘটনা শুধুই কি কারিগরি ত্রুটি, নাকি দায়িত্বশীলদের অযোগ্যতা ও নৈতিক দেউলিয়াত্ব, সে প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বলা বাহুল্য, একটি দেশের নাগরিকদের ছবি ও গোপন তথ্য তৃতীয় পক্ষের হাতে তুলে দেওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তার লঙ্ঘনই শুধু নয়, এটি মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌমত্বকে নিলামে তোলার নামান্তর। ইসির একদল অতি-উৎসাহী কর্মকর্তা আধুনিকায়নের নামে যে অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, এর মাশুল গুনতে হবে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে। যেখানে মাত্র চারটি সাধারণ তথ্য দিয়ে ভোটারকে ভোটকেন্দ্রের হদিস দেওয়া সম্ভব ছিল, সেখানে কেন ২৮টি ডেমোগ্রাফিক তথ্যের অ্যাকসেস দেওয়া হলো? একে কি কেবলই অযোগ্যতা বলে ধরে নেওয়া হবে, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে কোটি কোটি টাকার তথ্য বাণিজ্য?
আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে আমরা নিজেদের যতই স্মার্ট দাবি করি না কেন, আমাদের নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা যদি তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে বিকিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করা নিরর্থক। ভুলে গেলে চলবে না, এই স্পর্শকাতর তথ্যগুলো বেহাত হওয়া মানে একজন নাগরিককে অপরাধচক্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। আপনার এনআইডি তথ্য দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করা, আপনার পরিচয়ে জাল নথি তৈরি করে অপরাধ করা কিংবা আপনার গতিবিধির ওপর নজরদারি চালানো-সবই তখন দুষ্টচক্রের হাতের নাগালে চলে যায়।
ইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এখন একে-অন্যের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছেন; কিন্তু সত্য হলো, এই ডেটা চুরির ফলে ধসে পড়েছে আমাদের তথ্যগত গোপনীয়তা। প্রশ্ন জাগে, এর দায় কে নেবে? সরকার কি তদন্ত কমিটির নামে সময়ক্ষেপণ করে এই জাতীয় অপরাধকে আড়াল করবে? মনে রাখতে হবে, অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা না হলে নাগরিক আস্থার জায়গাটি চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। জনস্বার্থে এই তথ্য কেলেঙ্কারির সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হবে-এটাই প্রত্যাশা।





