বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে নতুন করে আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টারে ‘নির্বাচনের আগে দেশে আদিবাসী ছিল, সরকার গঠনের পর দেশে আদিবাসী নেই’—এমন বক্তব্যের মাধ্যমে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, “আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী, কেউ আদিবাসী নই”—যা নিয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হয়েছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
আদিবাসী অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের প্রশ্ন—নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো যদি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভোট, সমর্থন ও অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে সরকার গঠনের পর তাদের জাতিসত্তাগত পরিচয় নিয়ে কেন ভিন্ন অবস্থান দেখা যাবে?
তাদের মতে, কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক পরিচয় পরিবর্তিত হতে পারে না। পরিচয় কোনো নির্বাচনী ইশতেহার, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা ক্ষমতাসীন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়।
বাংলাদেশে ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা, গারো, ম্রো, বম, সাঁওতাল, তঞ্চঙ্গ্যা, খাসি, হাজং, খুমি, পাংখোয়া, লুসাইসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের বসবাস রয়েছে। প্রত্যেক জাতিসত্তার রয়েছে নিজস্ব ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, উৎসব ও জীবনধারা। এসব বৈচিত্র্য বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং নিজস্ব পরিচয়ের স্বীকৃতি, সমঅধিকার ও মর্যাদা চান। তাদের দাবি, “উপজাতি” বা “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” হিসেবে পরিচিত করার পরিবর্তে তাদের নিজস্ব আত্মপরিচয় ও জাতিসত্তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।
রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে তাই আদিবাসী অধিকারকর্মীদের প্রত্যাশা—নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে গিয়ে দেশের সব জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক ও জাতিগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ে স্পষ্ট ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করা।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এখন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বলছেন, অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও দেখতে চান তারা।
শুধু পরিচয় নয়, অধিকারও
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দাবির মধ্যে রয়েছে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, রাজনৈতিক অধিকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।
তাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি জাতিসত্তার শিশু যেন নিজের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
একই সঙ্গে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিও দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন পাহাড়ের বিভিন্ন সংগঠন ও জনগোষ্ঠী।
‘পরিচয় নিয়ে রাজনীতি নয়, স্বীকৃতি চাই’
আদিবাসী অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, বাংলাদেশের সৌন্দর্য ও শক্তি তার বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে। একদিকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, গারো, বম, সাঁওতালসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হবে, অন্যদিকে তাদের জাতিসত্তাগত পরিচয়কে অস্বীকার করা হবে—এ ধরনের দ্বৈত অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়।
তাদের ভাষায়—
“আমরা কারও বিরুদ্ধে নই। আমরা কারও অধিকার কেড়ে নিতে চাই না। আমরা শুধু চাই—নিজ পরিচয়ে বাঁচার অধিকার, মর্যাদা ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি।”
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তব নীতিনির্ধারণ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডেও দেশের সব জাতিসত্তার সমঅধিকার, মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করবে।
কারণ একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে অস্বীকার করে নয়—সব জাতিসত্তার পরিচয় ও মর্যাদাকে সম্মান করেই বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে।