Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বিবেকবার্তা

প্রচ্ছদ / জাতীয়
১:০৬ অপরাহ্ণ, ৭ জুলাই ২০২৬

সাত বছরেও শেষ হয়নি ডেথ রেফারেন্সের শুনানি

সাত বছরেও শেষ হয়নি ডেথ রেফারেন্সের শুনানি
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও আওয়ামী লীগ নেতাদের নৃশংসতার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। বিচারিক আদালত মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও সাত বছর পরও শেষ হয়নি মামলার চূড়ান্ত বিচারিক কার্যক্রম। হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি আটকে থাকায় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে হতাশা ও শঙ্কায় দিন কাটছে নুসরাতের পরিবারের।

২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। ওই ঘটনায় মামলা হলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর অভিযোগ প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার দিন কৌশলে সহপাঠীদের দিয়ে নুসরাতকে পরীক্ষা কেন্দ্রের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়।

ওই দিন নুসরাত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন। সেখানে হাত-পা বেঁধে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় ৮৫ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চারদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

তদন্ত শেষে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেককে এক লাখ টাকা জরিমানা করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেনÑমাদরাসাটির অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদরাসা কমিটির সহসভাপতি রুহুল আমিন, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, ছাত্র ও যুবলীগকর্মী নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, সাইফুর রহমান, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন, ইমরান হোসেন, মহিউদ্দিন শাকিল, মোহাম্মদ শামীম, নুসরাতের সহপাঠী কামরুন নাহার এবং উম্মে সুলতানা পপি।

হাইকোর্টে আটকে আছে চূড়ান্ত বিচার রায়ের পাঁচদিন পর একই বছরের ২৯ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার ডেথ রেফারেন্সসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পরে পেপারবুক প্রস্তুত ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর মামলাটি শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হয় এবং বিশেষ বেঞ্চ নির্ধারণ করা হয়।

২০২০ সালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ মামলার পেপারবুক (যাবতীয় নথি) ছাপানো শেষ করা হয়। ওই বছরের ২ মার্চ নুসরাত হত্যার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য বেঞ্চ নির্ধারণ করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। বিচারপতি সৌমেন্দ্র সরকার ও শাহেদ নূরুদ্দিনের বেঞ্চে এ মামলার শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বেঞ্চটি পরবর্তীকালে ভেঙে গেলে শুনানি আটকে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের করা আপিল ও জেল আপিল হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের কার্যতালিকায় দেখা যায়। পরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি হাবিবুল গনি ও জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নতুন বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়। ওই বেঞ্চে ১৬ আসামির মধ্যে সাতজনের ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষ হলেও বাকি নয়জনের শুনানি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে বেঞ্চ গঠন ও শুনানির ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

চলতি বছরের ১০ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে। নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের সঙ্গে আসামিদের আপিল ও জেল আপিল একসঙ্গে শুনানির জন্য বেঞ্চটির কার্যতালিকার ১৯ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে।

তবে কবে নাগাদ শুনানি হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। সম্প্রতি ওই বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির জানান, মামলাটি শুনানির তালিকায় রয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে শুনানিতে আসবে। বর্তমানে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিচারিক আদালতে কারো মৃত্যুদণ্ড হলে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় কার্যক্রম উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সে অনুসারে মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, বিচারের দ্বিতীয় ধাপে হাইকোর্টের রায়ের পর সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল আবেদন করতে পারবেন। বিচারের তৃতীয় ধাপে চূড়ান্ত শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করবে আপিল বিভাগ। রায়ে দণ্ড বহাল থাকলে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করা যাবে। আপিল বিভাগ ওই আবেদন নিষ্পত্তি করলে কারাবিধি অনুযায়ী দণ্ড কার্যকর করবে কারা কর্তৃপক্ষ।

ফেনী জেলা কারাগার সূত্র জানায়, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে দুজন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলম ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন। অন্য মামলায় হাজিরা থাকায় তাদের এখানে রাখা হয়েছে। বাকি আসামিরা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন কারাগারে আছেন।

আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এসএম শাহজাহান বলেন, মামলাটি শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চে তালিকায় রয়েছে। এর আগে অন্য একটি বেঞ্চে আংশিক শুনানি হয়েছিল। শিগগির এ মামলার আপিল শুনানি সম্পন্ন হবে।

পরিবার এখনো অপেক্ষায়

এদিকে, উচ্চ আদালতে শুনানি আটকে থাকায় নুসরাতের পরিবার এখনো আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তাদের বাড়িতে ২৪ ঘণ্টা পুলিশি নিরাপত্তা রয়েছে। প্রতিদিন শিফট করে দুই পুলিশ সদস্য নুসরাতদের সোনাগাজীর উত্তর চরচান্দিয়ার বাড়ির সামনে পাহারায় থাকেন।

নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চারদিন দগ্ধ অবস্থায় চরম কষ্ট পেয়ে আমার মেয়েটা মারা গেছে। মৃত্যুর আগে সে শুধু বিচার চেয়েছিল।

তিনি জানান, আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মরেও তিনি শান্তি পাবেন না। মৃত্যুর আগে নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচারের কার্যকারিতা দেখে যেতে চান তিনি।

নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, নুসরাত ছিল পরিবারের সবচেয়ে আদরের। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালত মামলাটি নিষ্পত্তি করলে নুসরাতের আত্মাও শান্তি পাবে।

তিনি অভিযোগ করেন, আসামিদের স্বজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিবারকে নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, যা তাদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফেনীর পিপি মেজবাহ উদ্দিন খান বলেন, রায় ঘোষণার পর তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে অপরাধীদের মধ্যে উল্টো উৎসাহ তৈরি হতে পারে। তাই নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের শুনানি দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর করা জরুরি। দ্রুত এ মামলার রায় কার্যকর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Facebook Comments Box
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
Advertise with us
আরও বিবেকবার্তা সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com

শিরোনাম