পাহাড়ি জনপদ বান্দরবানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পালিত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব মধু পূর্ণিমা। এ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে দিনব্যাপী ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা, দান ও ধর্মীয় আলোচনার আয়োজন করা হয়।
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রোজ শনিবার
সকাল থেকেই বান্দরবানের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে ভক্তদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও প্রবীণরাও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিহারে এসে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এ সময় বুদ্ধের উদ্দেশ্যে ফুল, মোমবাতি, মধু, খাবার ও বিভিন্ন ধর্মীয় সামগ্রী নিবেদন করা হয়।
উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন বিহারে পঞ্চশীল, অষ্টশীল ও দশশীল গ্রহণের পাশাপাশি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কাছ থেকে ধর্মীয় দেশনা ও নৈতিক শিক্ষামূলক বক্তব্য শোনেন দায়ক-দায়িকা এবং উপাসক-উপাসিকারা। রাজগুরু বৌদ্ধ বিহারসহ বিভিন্ন বিহারে বিশেষ প্রার্থনা ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধের জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার স্মরণে মধু পূর্ণিমা পালন করা হয়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বুদ্ধ যখন বনে ধ্যানরত ছিলেন, তখন একটি বানর তাঁকে মধু দান করেছিল। সেই ঘটনার স্মরণে ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মধু পূর্ণিমা পালন করে থাকেন। এ কারণে দিনটি ভাদ্র পূর্ণিমা নামেও পরিচিত।
ধর্মীয় এই উৎসবের অন্যতম শিক্ষা হলো দান, ত্যাগ, সংযম, মৈত্রী ও মানবকল্যাণ। তাই মধু পূর্ণিমায় ভক্তরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ভিক্ষুদের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করেন। পাশাপাশি বুদ্ধের উদ্দেশ্যে মধু, ভাত, পায়েস, ছোয়াইংসহ বিভিন্ন সামগ্রী উৎসর্গ করা হয়।
বান্দরবানের রাজগুরু বৌদ্ধ বিহার, উজানীপাড়া বৌদ্ধ বিহার, স্বর্ণ মন্দির, রামজাদীসহ জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে উৎসবকে ঘিরে ছিল ধর্মীয় আয়োজন। কোথাও ধর্মীয় দেশনা, কোথাও বিশেষ প্রার্থনা ও দান কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় বিভিন্ন স্থানে প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে দেশ, জাতি ও মানুষের শান্তি ও মঙ্গল কামনা করা হয়।
উৎসবে অংশ নেওয়া বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অংচমং, বাথোয়াই ও নিনি প্রু মারমা বলেন, মধু পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সী মানুষ বিহারে সমবেত হয়েছেন। ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পাশাপাশি বুদ্ধের উদ্দেশ্যে মধু ও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী দান করা হয়েছে। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে শান্তি ও মঙ্গল কামনা করা হবে।
রাজগুরু বৌদ্ধ বিহারের আবাসিক ভিক্ষু ধর্মজ্যোতি বলেন, বুদ্ধের প্রতি বানরের মধু দানের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তাৎপর্যকে স্মরণ করেই মধু পূর্ণিমা পালন করা হয়। এদিন ভক্তরা বিহারে সমবেত হয়ে ধর্মীয় দেশনা গ্রহণের পাশাপাশি দেশ ও মানুষের কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করেন।
মধু পূর্ণিমার আয়োজনে বড় ধরনের জাঁকজমকের পরিবর্তে প্রাধান্য পায় প্রার্থনা, ধর্মীয় অনুশাসন ও দানের চর্চা। একই সঙ্গে প্রবীণদের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি উৎসবটি পাহাড়ি জনপদে সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে ওঠে।