মানুষের জীবনে প্রতিবন্ধকতা আসে তাই বলে পিছিয়ে থাকেনা কোন কিছু।পিছিয়ে থাকে না এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন।শারীরক প্রতিবন্ধকতায় হাঁটতে না পারার কারনে চলাফেরায় নির্ভর করতে হচ্ছে হুইল চেয়ারের উপর। কিন্তু নিজেদের এই অদম্য ইচ্ছার কাছে হেরে গেছে তাদের সেই শারীরক প্রতিবন্ধকতা। এখন হুইল চেয়ারে করেই ক্রিকেট খেলে নিজেদের যোগ্যতা জানান দিয়ে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে সংকল্পবদ্ধ তারা।
আমি রীতা আক্তার আলাপচারিতায় রয়েছি বাংলাদেশ হুইল চেয়ার ক্রিকেট দলের অধীনায়ক মুহাম্মাদ মহসীনের সাথে।
মোহাম্মদ মহসিন শারীরিক প্রতিবন্দী এক মানুষ। ‘হাঁটি হাঁটি পা’ করার আগেই হারিয়ে ফেলেছেন হাঁটার শক্তিটুকুও। বয়স যখন ছয় মাস তখনই হঠাৎ একদিন এলোমেলা হয়ে গেল সবকিছু। পুরো শরীরটাই অবশ হয়ে যায়। মাত্র ছয় মাস বয়সে মহসিন আক্রান্ত হয়েছিলেন পোলিওতে। তখন থেকেই অন্যরকম জীবন শুরু হয় তার।বিবেকবার্তা কে বলেন,‘ছোটবেলা থেকেই আমি মাটিতে বসে খেলাধুলা করতাম। বন্ধুরা যখন বাইরে খেলতে যেত, তখন আমাকে নিত না। কষ্ট হতো ভীষণ। তখন থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আরও বেশি আকর্ষণ তৈরি হয়। ২০১০ সালে আমি প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের সঙ্গে খেলা চালিয়ে যাই। পরে নিয়ম চালু হলে হুইল চেয়ার ক্রিকেট দলের যাত্রা শুরু হয়।’
মোহাম্মদ মহসিন জানাচ্ছিলেন, ‘আমাদের দেশে প্রতিবন্ধীদের কোন ক্রিকেট দল আছে কিনা সেটা তখনো জানতাম না আমি। সেটা অনুসন্ধান করতে গিয়ে যোগাযোগ করি সেন্টার ফর রিহ্যাবিটেশন অফ দ্য প্যারালাইজডের (সিআরজি) প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালরি টেলরের সঙ্গে। তার উৎসাহে একটা দল গড়ার চিন্তা মগজে স্থায়ী হয়ে উঠে।’
মন খারাপ করা সেই সময়টাতে একদিন ফেসবুকে একটা ছবি পোস্ট করেন তিনি। যেখানে দেখা যায় হুইল চেয়ারে বসে ব্যাট করছেন। এই ছবিটাই ছিল তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। ২০১০ সালটা তার জীবনে সোনার হরফে লেখা থাকবে। সেই ছবির সূত্র ধরেই পরিচয় তখনকার ভারতের শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের কোচ হারুনুর রশিদের সঙ্গে। তার পরামর্শে এরপরই একটা দল দাঁড় করানোর কথা ভাবতে থাকেন।
তবে এতো কিছু করা সহজ ছিল না তার জন্য। এমনিতে নিজে প্রতিবন্ধী এক মানুষ। চলাফেরা করা ছিল কষ্টের কিন্তু দমে যাননি তিনি। যোগাযোগ রাখতে থাকেন হারুনুর রশীদের সঙ্গে। তার কাছ থেকে জেনে নেন প্রতিবন্ধীদের ক্রিকেটার আইন-কানুনের খুঁটিনাটি। এভাবে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় কোচ হারুনুর রশীদ আসেন ঢাকায়। তিনি বাংলাদেশকে তাদের সঙ্গে খেলার প্রস্তাব দেন।
ভ্যালেরি টেলর রাজি হয়ে যান সেই প্রস্তাবে। তবে গোটা একটি দল এক সুতোয় গাঁথা মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু উদ্যোমী মহসিন যখন আছেন তখন আর ভাবনা কি? ২০ জন প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়কে এক করে ফেলেন তিনি। সিআরপি কর্মী বুলবুলের অধীনে শুরু হয়ে ১৬ সদস্যের দলের অনুশীলন।
বলা হচ্ছিলো দলের নেতৃত্ব দেবেন হুইলচেয়ার নিয়ে খেলা মহসিন। ভারতীয় দলও এই নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হল একাদশ গড়তে গিয়ে দেখা গেল দলে মহসিন নেই। বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটে না তার ‘আমি রীতিমতো অবাক। একি হল। ব্যাপারটায় খোদ হারুনুর রশীদ অবাক হয়ে বলেন, তোমার হাত ধরে একটা দল হলো, অথচ সেই দলে তুমি নেই।’
বাংলাদেশ হুইল চেয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মহসিন বিবেকবার্তা’কে বলেন, ‘২০১৫ সালে দল প্রস্তুত হলে ২০১৬ সাল থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। আমাদের এই ক্রিকেট দেখে এশিয়াতে আরও ৫টি দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে হুইল চেয়ার ক্রিকেট। ২০১৯ ও ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় এশিয়া কাপ। এখনও বিশ্বকাপ হয়নি, তবে আয়োজনের কথা চলছে বৈশ্বিক ক্রিকেট সংস্থার সঙ্গে।’
মন ভাঙ্গলেও হাল ছাড়েননি মহসিন। তার পুরস্কারটাও মিলেছে। ২০১৪ সালে তার নেতৃত্বে ভারত সফরে যায় বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী দল। সেখানে ভারতীয় ডিসাবল স্পোর্টিং সোসাইটির সঙ্গে দল খেলে ৩ ম্যাচ টি-টুয়েন্টি সিরিজ।
কিন্তু সেই সফরে যাওয়াটা মোটেও সহজ ছিল না। আর্থিক সমস্যাটা এমন হয়ে উঠেছিল যে মনে হচ্ছিল ভারত যাওয়া হবে না। কিন্তু জেদ এতোটাই চেপে বসেছিল যে শেষ পর্যন্ত পরিবারের অবলম্বন ফ্লেক্সি লোডের দোকানটা বিক্রি করে দেন তিনি। পাশাপাশি জনতা ব্যাংকের সে সময়ের এমডি ড. আবুল বারাকাত বাড়িয়ে দেন সহযোগিতার হাত। বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টাস এসোসিয়েশনও এগিয়ে আসে। এভাবেই ২০১৪ সালের জুনে ভারত সফরে যায় দল। তাজমহল সিরিজে ২-১ এ জিতে দেশে ফিরে মহসিনের বাংলাদেশ। এরপর খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে ডেকে নিয়ে সংবর্ধনা দেন গোটা দলকে।
তারপর অবশ্য পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরের বছর আবার তার নেতৃত্বে দল যায় ভারতে। এমনকি বাংলাদেশে ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিটি) সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। ইংল্যান্ডে শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের কোচ ইয়ান মার্টিনের নেওয়া ওয়ার্কশপে অংশ নেন।
জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড ২০১৭ জাতীয়,এসওএস বাংলাদেশ কমিউনিটি চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ আন্তর্জাতিক,সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ আন্তর্জাতিক,মাইকেল মধুসূদন ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ যুব আইকন অ্যাওয়ার্ড ২০০৯ জাতীয়,ময়ূরপঙ্খী সমাজ কল্যাণ অ্যাওয়ার্ড ২০২০ জাতীয়,রোটারি ক্লাব জেলা সম্মেলন অংশগ্রহণ অ্যাওয়ার্ড ২০২০ জাতীয়,
অ্যাকশন এইড দ্বারা স্বেচ্ছাসেবক অ্যাক্টিভিজম অ্যাওয়ার্ড ২০২০ জাতীয়,
ইউসিইএফ বাংলাদেশ স্পেশাল গেস্ট হিসেবে ক্রেস্ট প্রদান ২০২০ জাতীয়,
আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক অ্যাওয়ার্ড (১ম স্থান) ২০২১ আন্তর্জাতিক,
বাংলাদেশ ডিজিটাল সোশ্যাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড ২০২১ জাতীয়,ডিওয়াইডিএফ যুব আইকন অ্যাওয়ার্ড ২০২২ জাতীয়,স্বপ্নজাত্রী অ্যাওয়ার্ড ২০২২ জাতীয়,
সফল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জাতীয় অ্যাওয়ার্ড ২০২৩ জাতীয়,
গ্লোবাল চেঞ্জমেকার্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৩ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিজয়ী মহসীন।