মানুষ ভাষার ব্যাকরণ শেখে স্কুলে, কিন্তু সম্পর্কের ব্যাকরণ শেখে জীবনের কাছে। দুঃখের বিষয়, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা আর প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে আমরা ভাষা যত শুদ্ধভাবে বলতে শিখছি, সম্পর্কের ভাষা ততই ভুলে যাচ্ছি।
আজকের মানুষ অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত, ভবিষ্যৎ গড়ার দৌড়ে ব্যস্ত, পরিবারের চাহিদা পূরণে ব্যস্ত। এই ব্যস্ততা অস্বীকার করার নয়। কিন্তু সেই ব্যস্ততার ফাঁকেই কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে একসঙ্গে বসে গল্প করার সময়, চোখে চোখ রেখে হাসার মুহূর্ত, কিংবা নিঃশব্দে হাত ধরে থাকার সহজ সৌন্দর্য।
গত শুক্রবার একটি ছোট্ট দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। দুপুরের পর একটি সিএনজিতে এক দম্পতি পাশাপাশি বসে আছেন। অথচ দুজনের দৃষ্টি দুটি আলাদা মোবাইলের পর্দায়। একই গাড়িতে, একই গন্তব্যে, কিন্তু যেন দুটি ভিন্ন জগতে তাদের অবস্থান। মনে হলো, শারীরিক দূরত্ব নয়, মানসিক দূরত্বই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি কখনো মানুষের স্পর্শ, আন্তরিক কথোপকথন বা ভালোবাসার উষ্ণতার বিকল্প হতে পারে না। সম্পর্ক টিকে থাকে উপস্থিতিতে, মনোযোগে, যত্নে এবং অনুভূতির বিনিময়ে।
সম্পর্কের ব্যাকরণ খুব কঠিন নয়। কর্মস্থলে বের হওয়ার আগে প্রিয় মানুষটিকে একটি আন্তরিক আলিঙ্গন, একটি মিষ্টি চুম্বন কিংবা ভালোবাসাভরা একটি বাক্য—”ভালো থেকো”—সারাদিনের ক্লান্তির মাঝেও শক্তি জোগাতে পারে। আবার ঘরে ফেরার সময় একটি ছোট্ট চকলেট, একটি ফুল, কিংবা শুধু একটি হাসিমাখা মুখ—এসবই বলে দেয়, “তোমাকে আমি মনে রেখেছি।”
একটি সুখী সম্পর্ক বড় বড় আয়োজনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন, সম্মান, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার ওপর। যে সম্পর্কে কথা থাকে, সেখানে ভুল বোঝাবুঝি কমে। যে সম্পর্কে স্পর্শ থাকে, সেখানে দূরত্ব কমে। আর যে সম্পর্কে কৃতজ্ঞতা থাকে, সেখানে ভালোবাসা দীর্ঘজীবী হয়।
আমরা যেন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করি, কিন্তু প্রযুক্তি আমাদের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ না করে। প্রতিদিন কিছু সময় মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে প্রিয় মানুষটির চোখে চোখ রাখি। কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ ব্যাংক ব্যালেন্স নয়, স্মৃতির ভাণ্ডারই সঙ্গে নিয়ে বাঁচে।
সম্পর্কের ব্যাকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম একটাই—ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়। কারণ অপ্রকাশিত ভালোবাসা ধীরে ধীরে নীরবতায় হারিয়ে যায়, আর প্রকাশিত ভালোবাসাই একটি সাধারণ জীবনকে অসাধারণ করে তোলে।
তালুকদার লাভলী
কবি ও কথাসাহিত্যিক