মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বুধবার (২৪ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৬ ডলার ৭১ সেন্টে নেমে আসে, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ০.৫ শতাংশ কম। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও কমে ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার ৮৫ সেন্টে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুদ্ধ ও সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কায় তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তা অনেকটাই কমে এসেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে।
দেশীয় মুদ্রায় কত দাঁড়াচ্ছে তেলের দাম?
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্য প্রায় ১২৩ টাকা ধরা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯ হাজার ৪৩৫ টাকা। প্রতি লিটার হিসেবে যার মূল্য প্রায় ৫৯ টাকা ৩০ পয়সা।
অন্যদিকে ডব্লিউটিআই ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮ হাজার ৯৬০ টাকা, যা প্রতি লিটার হিসেবে প্রায় ৫৬ টাকা ৩৫ পয়সা।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের এই মূল্য সরাসরি খুচরা বাজারে প্রতিফলিত হয় না। কারণ এর সঙ্গে পরিশোধন ব্যয়, পরিবহন খরচ, আমদানি শুল্ক, কর এবং বিপণন ব্যয় যুক্ত হয়।
বাজারে স্বস্তির পেছনে যেসব কারণ
তেলের দাম কমার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনাকে। পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার ইঙ্গিতও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এ ছাড়া পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলো ধীরে ধীরে চলাচল শুরু করায় সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির আশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার খবরে বাজারে স্বস্তি ফিরেছে।
হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক হচ্ছে নৌ চলাচল
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওমান ও ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন পক্ষ সমন্বয় করে কাজ করছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরে অপেক্ষমাণ কয়েকটি সুপারট্যাঙ্কার ইতোমধ্যে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধবিরতির পর শত শত জাহাজ এবং হাজারো নাবিককে নিরাপদে চলাচলের সুযোগ করে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি
জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক আরও ইতিবাচক দিকে এগোলে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমতে পারে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। ফলে নতুন কোনো উত্তেজনা তৈরি হলে তেলের বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের নজর হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই কেন্দ্রীভূত রয়েছে।