চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার শিক্ষার্থীদের সাঁতারে সহজাত দক্ষতা থাকলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চরম উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে সংকটে পড়েছে স্থানীয় সাঁতারুরা। ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার চলতি মৌসুমে সন্দ্বীপের সাঁতারুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দৃশ্যমান অনীহা ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। অথচ গত আসরেই জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত সাঁতার প্রতিযোগিতার ৯টি ইভেন্টের ৯টিতেই গৌরব এনে দিয়েছিল এই সাঁতারুরা এবং জেলা পর্যায়ে সন্দ্বীপ অর্জন করেছিল শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছর অনুষ্ঠিত ৫২তম গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়ে অভাবনীয় সাফল্য দেখায় সন্দ্বীপ উপজেলা। জেলা সদরের আধুনিক সুইমিংপুলের সুবিধা পাওয়া প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সাঁতারের সব কটি ইভেন্টে পদক ছিনিয়ে এনেছিলেন সন্দ্বীপের ক্রীড়াবিদেরা। চরম যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা এবং আধুনিক ট্র্যাক বা পুলের অভাব সত্ত্বেও সেবার জেলা ক্রীড়াঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই দ্বীপের সাঁতারুরা।
সেই অভাবনীয় সাফল্যের পরও চলতি প্রতিযোগিতায় সাঁতারুদের প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পর্যায়ে কেবল দায়সারা গোছের একটি প্রতিযোগিতা দিয়েই বছরের পর বছর সন্দ্বীপে চলছে জাতীয় ক্রীড়া আয়োজন। যাতায়াতব্যবস্থা ও থাকা-খাওয়ার সমস্যার অজুহাতে জেলা পর্যায়ে অংশ নেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিজ আগ্রহে জেলায় যেতে চাইলেও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যাতায়াত বা আনুষঙ্গিক খরচের দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করা হচ্ছে।
জানা যায়, গত বছর সন্দ্বীপ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে ও প্রবাসীদের সংগঠন ‘সন্দ্বীপ ইউনাইটেড ইউএসএ’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় সন্দ্বীপের সাঁতারু দল জেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখেছিল।
এবার পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে জানতে চাইলে সন্দ্বীপ ইউনাইটেড ইউএসএর সভাপতি এস এম ফেরদৌস জানান, প্রতি বছর এভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়; এটি মূলত সংশ্লিষ্ট স্কুল ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের দায়িত্ব। গত বছর কেবল সন্দ্বীপের ছেলেদের প্রতিভা ও দক্ষতা প্রমাণের পথ দেখাতে তারা এগিয়ে এসেছিলেন। গত বছর ভূমিকা রাখলেও চলতি বছর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার নবগঠিত কমিটিকেও এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
প্রতিযোগী ও দক্ষিণ-পূর্ব সন্দ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোবায়ের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, ‘গ্রামের পুকুরে সাঁতার কেটে আমাদের বড় ভাইয়েরা গত বছর চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়ে পদক জিতেছিল। সেই অনুপ্রেরণায় আমরা এবার অংশ নিয়েছি। কিন্তু স্কুল থেকে পরবর্তী কোনো নির্দেশনা পাচ্ছি না।’
স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের একজন শরীরচর্চা শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সন্দ্বীপের ছেলেমেয়েদের সাঁতারের যে প্রাকৃতিক প্রতিভা আছে, তা দেশের খুব কম জায়গায় দেখা যায়। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাঁতারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ বা পরিকল্পনা থাকে না। প্রধান শিক্ষকদের কাছে বিষয়টি কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা। সঠিক নজরদারি থাকলে এখান থেকেই জাতীয় মানের সাঁতারু তৈরি হতো।
৫৩তম গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এবার সন্দ্বীপে শুধু সাঁতার ও দাবা ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা পর্যায়ে সাঁতারে বিজয়ী সন্দ্বীপের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শহরে যাতায়াতে সমস্যা পোহাতে হয়। অন্য উপজেলার মতো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব নয়। এসব সমস্যার কারণে শহরে অতিরিক্ত এক বা দুই দিন থাকা-খাওয়ােএবং শিক্ষার্থীদের দেখভালের দায়িত্ব এড়াতে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এই অনিয়ম।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, উপজেলা থেকে জেলা পর্যায়ে প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের দায়িত্ব।
গতবার স্বর্ণপদক জেতার পরও এবার কেন জেলা পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাঠানো হচ্ছে না—জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ইসমত আরা বেগম জানান, তারা উপজেলা পর্যায়ের বিজয়ীদের তালিকা জেলায় পাঠিয়েছেন। এখন জেলা পর্যায়ে অংশগ্রহণ করবে কি করবে না, সেটা শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপার।