Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বিবেকবার্তা

প্রচ্ছদ / মতামত
৮:১৩ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০২৬

নীলাচলের একটি ছবি যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তৃত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নীলাচলের একটি ছবি যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তৃত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
জেভিন ত্রিপুরা
৪ মিনিটে পড়ুন |

একটি ছবি। দৃশ্যটি বান্দরবানের নীলাচলের। সামনে পাহাড়, দূরে সবুজের বিস্তীর্ণ সমুদ্র, আর সেই প্রকৃতির মাঝখানে একজন প্রবীণ পাহাড়ি নারী—কোমরে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, হাতে দা, পিঠে ঝুড়ি। তিনি যাচ্ছেন তাঁর জুম বা বাগানের কাজে।

ছবিটি দেখলে প্রথমে চোখে পড়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে এই একটি ছবিই যেন বলে যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেকটি গল্প—পাহাড়ের সৌন্দর্যকে পর্যটনের জন্য সাজাতে গিয়ে সেই পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের জীবন ও চলাচলের বাস্তবতা আমরা কতটা দেখছি?

ছবিতে দেখা পথটি হয়তো একজন পর্যটকের কাছে নীলাচলের সৌন্দর্যের অংশ। কিন্তু স্থানীয় একজন পাহাড়ি মানুষের কাছে এমন পথ হতে পারে জুমে যাওয়ার রাস্তা, বাগানে যাওয়ার পথ কিংবা প্রতিদিনের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত একটি চলাচলের মাধ্যম।

এটাই পাহাড়কে দেখার দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।

পর্যটনের চোখে পাহাড়, নাকি মানুষের চোখেও?

বান্দরবানসহ পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অঞ্চল। পাহাড়, মেঘ, ঝরনা, বন, নদী ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির টানে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক এখানে আসেন।

পর্যটনের বিকাশ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। নতুন রাস্তা, স্থাপনা ও পর্যটন অবকাঠামোও প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্নটি সেখানে নয়।

প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়ন পরিকল্পনায় পাহাড়ের দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের জীবনযাপন, চলাচল, কৃষিকাজ ও ঐতিহ্যগত ব্যবহারের জায়গাগুলো কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে?

কারণ পর্যটকের কাছে পাহাড় একটি দর্শনীয় স্থান হলেও স্থানীয় পাহাড়ি মানুষের কাছে সেই পাহাড়ই তাঁর জীবন।

যে জায়গায় পর্যটক ছবি তুলছেন, সেখানে হয়তো কোনো পরিবারের জুম রয়েছে। যে পথ দিয়ে পর্যটক প্রকৃতি দেখতে যাচ্ছেন, সেই পথ হয়তো কোনো পাহাড়ি নারী প্রতিদিন কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার করেন। যে পাহাড়কে পর্যটনের জন্য নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে, সেই পাহাড়ের সঙ্গে হয়তো একটি জনগোষ্ঠীর বহু প্রজন্মের জীবন ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

নীলাচল শুধু একটি উদাহরণ

এই ছবিটি নীলাচলের। কিন্তু প্রশ্নটি শুধু নীলাচলকে ঘিরে নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পর্যটন সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ব্যবহৃত জায়গা, চলাচলের পথ এবং জীবিকার পরিসর নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন ও উদ্বেগ সামনে এসেছে।

কোনো জায়গাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সময় সেখানে বসবাসকারী মানুষের মতামত, তাঁদের ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ এবং জীবিকার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা না করলে উন্নয়ন ও স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

আর সেই দূরত্ব যত বাড়বে, পর্যটনের সৌন্দর্যের আড়ালে স্থানীয় মানুষের অসুবিধাও তত বেশি অদৃশ্য থেকে যেতে পারে।

পাহাড়ের মানুষের পথ কি শুধু একটি ‘রাস্তা’?

একজন পাহাড়ি মানুষের কাছে একটি পথের মূল্য শুধু তার দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ দিয়ে মাপা যায় না।

সেই পথ হয়তো তাঁকে নিয়ে যায় জুমে।
সেই পথ হয়তো তাঁর বাগানে যাওয়ার একমাত্র সহজ রাস্তা।
সেই পথ হয়তো তাঁর পরিবারের খাবার ও আয়ের সঙ্গে যুক্ত।
সেই পথ দিয়ে হয়তো তাঁর বাবা-মা, দাদা-দাদিরাও বছরের পর বছর চলেছেন।

তাই কোনো পথের চরিত্র পরিবর্তন করার আগে শুধু পর্যটকের সুবিধা নয়, সেই পথের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় মানুষের জীবনও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

উন্নয়ন চাই, কিন্তু অংশীদারিত্বের সঙ্গে

পাহাড়ের মানুষ উন্নয়নের বিরোধী—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পর্যটন ও অর্থনৈতিক সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রয়োজন।

তবে উন্নয়ন যেন স্থানীয় মানুষকে পাশ কাটিয়ে নয়, তাঁদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে হয়—এটাই গুরুত্বপূর্ণ।

পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠুক। পর্যটক আসুক। স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হোক। কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে—স্থানীয় মানুষের চলাচলের পথ, জীবিকা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা যেন অযথা সংকুচিত না হয়।

পর্যটন যদি স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে, তাঁদের সংস্কৃতিকে সম্মান করে এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে, তখন সেই পর্যটনই হতে পারে টেকসই ও মানবিক পর্যটনের উদাহরণ।

ছবির প্রবীণ নারীটি যেন নীরব প্রশ্ন

নীলাচলের ছবিতে থাকা প্রবীণ নারীটি হয়তো কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না। তিনি শুধু তাঁর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে নিজের কাজে যাচ্ছেন।

কিন্তু তাঁর সেই নীরব পথচলাই যেন আমাদের প্রশ্ন করে—

“এই পাহাড়ের সৌন্দর্য আপনার কাছে যেমন, আমার কাছেও কি তেমন?
আপনি এখানে সৌন্দর্য দেখতে এসেছেন; আমি এখানে আমার জীবন খুঁজতে এসেছি।
আপনার কাছে যে জায়গা পর্যটনকেন্দ্র, সেটিই হয়তো আমার জীবিকার জায়গা।”

তাই পাহাড়কে শুধু পর্যটনের চোখে দেখলে ছবির অর্ধেকটাই দেখা হবে।

পুরো ছবিটি দেখতে হলে দেখতে হবে পাহাড়, প্রকৃতি, পর্যটন এবং পাহাড়ের মানুষের জীবন—সবকিছুকে একসঙ্গে।

শেষ কথা

পর্যটন হোক, উন্নয়ন হোক—কিন্তু পাহাড়ের মানুষকে বাদ দিয়ে নয়।

কারণ পাহাড়ের সৌন্দর্য শুধু পাহাড়ে নয়; সেই পাহাড়ের সঙ্গে যাঁরা যুগের পর যুগ বসবাস করছেন, তাঁদের জীবন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের মধ্যেও সেই সৌন্দর্য নিহিত।

নীলাচলের এই একটি ছবি তাই শুধু একটি দৃশ্য নয়—এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন, পর্যটন ও স্থানীয় মানুষের অধিকারকে একই ফ্রেমে দেখার একটি সুযোগ।

প্রশ্ন শুধু পাহাড় কতটা সুন্দর—প্রশ্ন হলো, সেই সৌন্দর্যের মধ্যে পাহাড়ের মানুষ কতটা দৃশ্যমান।

Advertise with us
আরও বিবেকবার্তা সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com

শিরোনাম