Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বিবেক বার্তা

কলাম
৯:২৩ অপরাহ্ণ, ৭ জুন ২০২৬

অষ্টাদশ সংশোধনী ও দেশের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ

শামীম ইকবাল বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট ২০২৪ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, গণভোট আয়োজন এবং পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র একটি নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন যত দ্রুত […]

অষ্টাদশ সংশোধনী ও দেশের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

শামীম ইকবাল

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট ২০২৪ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, গণভোট আয়োজন এবং পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র একটি নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন যত দ্রুত ঘটে, তার সাংবিধানিক বৈধতা ও স্থায়িত্বের প্রশ্ন তত দীর্ঘস্থায়ী হয়। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন, সামরিক শাসন, পঞ্চম সংশোধনী, সপ্তম সংশোধনী এবং অষ্টম সংশোধনী সম্পর্কিত বিচারিক সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিবর্তনের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরে।

এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো, প্রস্তাবিত অষ্টাদশ সংবিধান সংশোধনীকে ঘিরে সম্ভাব্য আইনগত, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি চিহ্নিত করা।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : সাংবিধানিকতা নাকি বিপ্লব

৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনাকে ঘিরে মূলত তিনটি মতবাদ গড়ে উঠেছে। ক. সংবিধানপন্থি মতবাদ : এই মতবাদের অনুসারীরা মনে করেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সব পদক্ষেপ বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপ, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং পরবর্তী নির্বাচন-সবকিছুই সংবিধানের ধারাবাহিকতার অংশ। খ. বিপ্লবপন্থি মতবাদ : এ পক্ষের মতে, ৫ আগস্ট ছিল একটি সফল গণবিপ্লব। প্রধানমন্ত্রী গণভবন ত্যাগ করার পর কার্যত পূর্ববর্তী সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণের বিপ্লবী ম্যান্ডেট থেকে বৈধতা অর্জন করে। গ. পতিত সরকারপন্থি মতবাদ : তাদের দাবি, সংবিধান অনুযায়ী বিকল্প সরকার গঠনের সুযোগ ছিল। সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ছিল অসাংবিধানিক পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতে বিচারিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া : সাংবিধানিক প্রশ্ন

রাষ্ট্রপতি ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। সরকারি সারসংক্ষেপে যুক্তি হিসাবে বলা হয়েছিল, ‘সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলা, জনস্বার্থ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন যাতে বিপদের সম্মুখীন না হয়।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, সংবিধানের ৫৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ এবং বিকল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুপস্থিতি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি আবশ্যক। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়-রাষ্ট্রপতি কি সংবিধানের ৫৭(২) অনুচ্ছেদের পূর্ণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিলেন, নাকি ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের ব্যতিক্রমী ব্যাখ্যার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? এ প্রশ্ন ভবিষ্যতের বিচারিক বিতর্কের অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকার এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ

সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকে আপিল বিভাগের মতামত গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়-১. আপিল বিভাগের সব বিচারপতিকে কি নোটিশ প্রদান করা হয়েছিল? ২. যথাযথ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কি? ৩. শুনানি কি উন্মুক্ত আদালতে হয়েছিল? ৪. মতামত প্রদানের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে অনুসৃত হয়েছিল কি? ভবিষ্যতে এ প্রশ্নগুলো বিচারিক পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে পারে।

নির্বাচন আয়োজন ও ১২৩ অনুচ্ছেদের প্রশ্ন

সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান রয়েছে। দ্বাদশ সংসদ ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বিলুপ্ত হয়েছিল। সেই হিসাবে সাংবিধানিক সময়সীমার প্রশ্ন সামনে আসে। অতএব প্রশ্ন হলো, পরবর্তী নির্বাচন কোন আইনগত কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল? যদি তা সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের আওতায় না হয়ে থাকে, তবে তার বৈধতার উৎস কোথায়?

১৩ নভেম্বর ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপন নং-০১

অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক জারিকৃত এ প্রজ্ঞাপনকে অনেকেই পরবর্তী সাংবিধানিক কাঠামোর প্রথম আইনগত ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই কি এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি করা উচিত ছিল? প্রজ্ঞাপনের বৈধতা কী? এটি কি সংবিধানের বাইরে নতুন আইনগত ভিত্তি তৈরি করেছে? ভবিষ্যতের সাংবিধানিক বিতর্কে এ প্রজ্ঞাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।

দায়মুক্তি প্রশ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য দায়মুক্তি প্রদানসংক্রান্ত অধ্যাদেশ ইতোমধ্যে সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তি প্রদানের নজির বিদ্যমান। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, দায়মুক্তি কি কেবল একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব? নাকি সংবিধানের মূল কাঠামোর মধ্যেই এর স্পষ্ট ভিত্তি থাকা প্রয়োজন? এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব করা যায়-সংবিধানের প্রস্তাবনায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা; অথবা ৪৬ অনুচ্ছেদে পৃথক উপধারা সংযোজন করা।

গণভোট : সংসদের চেয়ে শক্তিশালী বৈধতা?

গণভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণ করা হয়। বিশ্বের বহু দেশে, বিশেষত তুরস্ক, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে গণভোটের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কখনো কখনো ৪০ শতাংশেরও কম জনপ্রিয় ভোটের ভিত্তিতে সম্ভব। অন্যদিকে গণভোটে প্রত্যক্ষ জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করে। এ কারণে অনেকের মতে, দায়মুক্তি, অন্তর্বর্তী সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিষয়গুলো কেবল সংসদের ভোটে নয়, গণভোটের মাধ্যমেও বৈধতা লাভ করা উচিত।

উচ্চকক্ষ : আসনভিত্তিক নাকি ভোটভিত্তিক

প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি পক্ষ মনে করে, নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হওয়া উচিত। অপর পক্ষের মত-জনপ্রিয় ভোটের অনুপাতে (PR System) উচ্চকক্ষ গঠন করা উচিত। দীর্ঘমেয়াদে কোন পদ্ধতি অধিক প্রতিনিধিত্বশীল হবে-তা গভীর আলোচনার দাবি রাখে।

অষ্টম সংশোধনী মামলা ও মৌলিক কাঠামোর প্রশ্ন

সুপ্রিমকোর্ট অষ্টম সংশোধনী মামলায় রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো বা Basic Structure Doctrine-এর ধারণা প্রতিষ্ঠা করে। প্রশ্ন হলো, উচ্চকক্ষ গঠন, ক্ষমতার পুনর্বণ্টন অথবা সাংবিধানিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন কি সেই রায়ের আলোকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে? যদি পারে, তবে ভবিষ্যতে গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রশ্ন আবারও সামনে আসতে পারে।

উপসংহার

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সাংবিধানিক বৈধতা সবসময় একই গতিপথে চলে না। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকার, গণভোট, দায়মুক্তি এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ-সবকিছুই এখন অষ্টাদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে একটি স্থায়ী সাংবিধানিক কাঠামো লাভের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু এই সংশোধনীর মধ্যে আইনগত দুর্বলতা, সাংবিধানিক অস্পষ্টতা অথবা ভবিষ্যৎ বিচারিক চ্যালেঞ্জের উপাদান যদি থেকে যায়, তবে তা একদিন রাষ্ট্রের জন্য নতুন সংকটের কারণ হতে পারে।

সুতরাং, অষ্টাদশ সংশোধনী কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিপ্রস্তর। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, সাময়িক রাজনৈতিক বিজয় স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক বৈধতা নিশ্চিত না হলে সেই বিজয়ের স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এ কারণেই অষ্টাদশ সংশোধনী প্রণয়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা, আইনগত দৃঢ়তা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য।

শামীম ইকবাল : সংবিধান বিশ্লেষক, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর

যে বাঙালিকে মনে রেখেছেন জাপানিরা
৩ সপ্তাহ আগে

Advertise with us
আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 
Advertise with us
আরও বিবেক বার্তা সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com