Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বিবেক বার্তা

Uncategorized
১২:০৭ অপরাহ্ণ, ১৯ মে ২০২৬

যে বাঙালিকে মনে রেখেছেন জাপানিরা #19

সকালে জাপানের নিশি-ওজিমা এলাকার একটি পার্কে হাঁটার সময় পরিচয় হয় ৭৪ বছর বয়সী তায়েকো সাতোর সঙ্গে। বাংলাদেশের কথা শুনে খানিকটা আবেগ-আপ্লুত হয়ে আর ভক্তিসহকারে বললেন, ‘তোমার দেশের রাধাবিনোদ পাল খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ন্যায়বিচারক, জাপানিদের সম্মান রক্ষা করেছেন। এখনো আমরা তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।’ প্রায় ৭৭ বছর পরও তায়েকোর মতো অনেক […]

যে বাঙালিকে মনে রেখেছেন জাপানিরা #19
৬ মিনিটে পড়ুন |

সকালে জাপানের নিশি-ওজিমা এলাকার একটি পার্কে হাঁটার সময় পরিচয় হয় ৭৪ বছর বয়সী তায়েকো সাতোর সঙ্গে। বাংলাদেশের কথা শুনে খানিকটা আবেগ-আপ্লুত হয়ে আর ভক্তিসহকারে বললেন, ‘তোমার দেশের রাধাবিনোদ পাল খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ন্যায়বিচারক, জাপানিদের সম্মান রক্ষা করেছেন। এখনো আমরা তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।’

প্রায় ৭৭ বছর পরও তায়েকোর মতো অনেক জাপানির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন ১৮৮৬ সালে কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণকারী রাধাবিনোদ পাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রবাহিনীর টোকিও ট্রায়ালে বিভিন্ন দেশের ১১ বিচারপতির মধ্যে একজন ছিলেন রাধাবিনোদ, যিনি জাপানের যুদ্ধকালীন শীর্ষ নেতা ও সামরিক কর্মকর্তাদের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।

রাধাবিনোদ পালের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই জাপানকে অনেক কম ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। তার আহ্বানে সাড়া দিয়েই ভবিষ্যতে যুদ্ধে না জড়িয়ে শান্তির পক্ষে থাকার ঘোষণা দিয়েছিল জাপানিরা। নয়তো জাপানকে এখনো সেই যুদ্ধের ঘানি টানতে হতো। আজকের উন্নত ও ভদ্র জাপানকে হয়তো বিশ্ববাসী দেখত না।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জাপানিদের স্মৃতিতে চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে আছে রাধাবিনোদ পালের নাম। প্রবীণ জাপানিরা তো বটেই, নতুন প্রজন্মরাও তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। জাপানের জাসুকুনি মন্দিরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এই বিচারকের। প্রতিবছর জাপানিরা হিরোশিমা-নাগাসাকি দিবসে রাধাবিনোদ পালকে স্মরণ করে। দেশটির টিভি চ্যানেলেও তাকে নিয়ে প্রচারিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান।

প্রায় ৩৩ বছর ধরে জাপানে আছেন প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক এবং আন্তর্জাতিক বাংলা ভাষা পরিষদ জাপান শাখার সভাপতি পি আর প্ল্যাসিড। তার বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায়।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাপানিরা রাধাবিনোদ পালকে এত বেশি শ্রদ্ধা করে যে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তারা তাকে ত্রাণকর্তা মনে করে। বিশেষ দিবসে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। তার কারণেই জাপানিদের অনেকে এখনো বাংলাদেশিদের গুরুত্ব দেয়। তবে নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ তাকে ভারতীয় বাঙালি হিসেবে জানে।’

জাপানের টোকিওর চিয়োদা অঞ্চলে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের (যারা যুদ্ধে নিহত) স্মৃতির সম্মানে ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ইয়োসুকুনি স্মৃতিসৌধ। সেখানে একটি মাত্র ব্যতিক্রমী স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে রাধাবিনোদ পালের স্মরণে। তার ভাস্কর্য সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে জাপানের কিয়োতো শহরে। ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে জাপানের তৎকালীন সম্রাট হিরোহিতো তাকে জাপানের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘কোক্কা কুনশোও’ পদকে ভূষিত করেন। ‘ফ্রিডম অব দ্য সিটি অব টোকিও অ্যান্ড কিয়োতো’ সম্মানে ভূষিত করার পাশাপাশি তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদাও দেওয়া হয়। টোকিওর একটি সড়কের (অ্যাভিনিউ) নাম তার নামানুসারে রাখা হয়েছে।

রাধাবিনোদ পাল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে একাধিকবার জাপানে গেছেন সে দেশের আমন্ত্রণে। সম্রাট হিরোহিতো ছাড়াও রাধাবিনোদের বড় সমর্থক ছিলেন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের দাদা নোবুসুক কিশি, যিনি ১৯৫০ সালের শেষদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী হন।

টোকিও ট্রায়াল : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধের সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের জন্য জাপানের রাজনীতিক, সেনা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আরও কিছু ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিজয়ী মিত্রশক্তি। মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের নির্দেশে ১৯৪৫ সালে লন্ডন সনদের মাধ্যমে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল। এটি টোকিও ট্রায়াল নামেও পরিচিত।

অস্ট্রেলিয়ার বিচারপতি স্যার উইলিয়াম এফ ওয়েবকে প্রধান করে গঠিত ওই ট্রাইব্যুনালে ১১ জন বিচারক ছিলেন, যাদের একজন রাধাবিনোদ পাল। বাকিরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক।

ওই ট্রাইব্যুনাল শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হওয়া যুদ্ধাপরাধ বিবেচনা না করে ১৯৩১ সালে জাপানের মাঞ্চুুরিয়া দখল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সব যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করে। শান্তিবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ এই তিন ধরনের অপরাধের অভিযোগ আনা হয় অন্তত ২৮ জন জাপানি রাজনীতিক, সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

ট্রাইব্যুনালে জাপানি নেতা ও কর্মকর্তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। বিচারপতি রাধাবিনোদ অন্য বিচারকদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তার ভিন্নমতের কারণ ব্যাখ্যা করেন। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের অপরাধ তিনি অস্বীকার করেননি।

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার কথা ট্রাইব্যুনালকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘জাপানকে এককভাবে যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী করা চরম ভুল হবে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতম নৃশংসতা। জাপানই একমাত্র দেশ নয়, যারা এ ধরনের অপরাধ করেছে বরং জাপানের বিচার করতে বসা মিত্রপক্ষের অনেকই যুদ্ধের সময় একই ধরনের অপরাধ করেছে। জাপানিদের বিচার করতে হলে বাকিদেরও বিচার করতে হবে।’

দোষী সাব্যস্ত জাপানিদের সম্পর্কে রাধাবিনোদ বলেছিলেন, ‘জাপান যখন যুদ্ধে গিয়েছিল, তখন এ অপরাধের জন্য কোনো আইন ছিল না। এ আইন তৈরি হয় পরে। আইন তৈরি করার পর আগের অপরাধের বিচার করা যৌক্তিক নয়। তাই আসামিদের খালাস দেওয়া উচিত। মিত্রবাহিনী নিজেদের বিভিন্ন অপরাধের পরও একতরফাভাবে জাপানিদের ওপর দায় চাপাতে নিজেরা এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে।’ তার ভিন্নমতের বিষয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

বলা হয়ে থাকে, জাপানের পক্ষে রাধাবিনোদ পালের রায়ের জন্যই ওই ট্রায়ালের কয়েকজন বিচারক তাদের রায় কিছুটা নমনীয় করেছিলেন। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের বিচারপতি আংশিকভাবে তাকে সমর্থনও দিয়েছিলেন। ট্রায়ালের মূল রায় ও পর্যবেক্ষণ ছিল ১২৩৫ পৃষ্ঠার। পরে মূল রায় প্রকাশিত হয়েছিল ৮০০ পৃষ্ঠায়। রায়ে জাপানের রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক নেতাদের অনেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ থেকেও বেঁচে গিয়েছিল জাপান।

বিচারের পরে ১৯৫২ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমার শান্তি স্মৃতি উদ্যানে দাঁড়িয়ে পারমাণবিক বোমা হামলার অষ্টম বার্ষিকীতে জাপানিদের উদ্দেশে রাধাবিনোদ বলেছিলেন, জাপানিরা আবার যুদ্ধে জড়ালে হিরোশিমার নৃশংসতায় নিহত নিরীহ মানুষের প্রতি চূড়ান্ত অবমাননা করা হবে। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাপানিরা যুদ্ধে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তারা রাধাবিনোদকে আশ্বস্ত করেছিল, জাপান সব সময় শান্তির পক্ষে থাকবে।

রাধাবিনোদের বেড়ে ওঠা : তার শৈশব-কৈশোর ছিল নিদারুণ কষ্টের। তার শিশুকালে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন তার বাবা। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা রাধাবিনোদ কৈশোরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করেন। নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় ভীষণ ভালো ফল করায় মাসিক দুই টাকার বৃত্তি পান তিনি। নতুন স্কুলে ভর্তির জন্য তাকে তার মা ও বোনকে নিয়ে যেতে হয় মাসির বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার মোড়ভাঙ্গা গ্রামে।

স্কুলে ভর্তির পর বোয়ালিয়া বাজারে মামার দোকানে কাজ শুরু করেন দুমুঠো খাবার জোগাড়ের জন্য। নদী পার হয়ে প্রায় সাত মাইল দূরে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো তাকে। ফলে প্রায়ই ক্লাসে দেরি হতো। অভাবের কারণে একসময় পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছিল তাকে। তার মা বিভিন্নজনের সহায়তায় আবার তার পড়ালেখার ব্যবস্থা করেন। অভাবের মধ্যেও পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কটূক্তিও হজম করতে হয়েছে তাকে।

কুষ্টিয়া জিলা স্কুল থেকে ১৯০৩ সালে এন্ট্রান্স পাসের পর ১৯০৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন রাধাবিনোদ। ভর্তি হন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৯০৮ সালে গণিতে অনার্স পাস করে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি আইন বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে এলএলএম পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন ১৯২০ সালে। ১৯২৪ সালে আইনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ময়মনসিংহ কোর্টে ওকালতির চর্চাও করেন। ছিলেন কলকাতা ল কলেজের অধ্যাপক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত। ভারতের ব্রিটিশ সরকার ১৯২৭ সালে তাকে আইনি উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৪১ সালে কলকাতার উচ্চ আদালতের বিচারক হন রাধাবিনোদ।

১৯৪৬ সালে অবসর নিয়ে কুষ্টিয়ায় নিজ গ্রামে ফিরে আসার পর সে বছরই আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পান তিনি। দেশ ভাগের পর রাধাবিনোদ পাল ভারতে চলে যান। ১৯৬৭ সালে মৃত্যু হয় বিচারক রাধাবিনোদ পালের। ২০০৭ সালে ভারতে গিয়ে লোকসভায় এক ভাষণে রাধাবিনোদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। কলকাতায় গিয়ে তার ছেলের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন তিনি।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১ 
Advertise with us
আরও বিবেক বার্তা সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com