
ড. মাহফুজ পারভেজ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি, কূটনীতি ও কৌশলের পাশাপাশি একটি অদ্ভুত ধারণা বহুদিন ধরে আলোচিত ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা উন্মাদ তত্ত্ব। এর মূল বক্তব্য হলো, যদি কোনো রাষ্ট্রনেতা নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন যেন তিনি যে কোনো সময় অপ্রত্যাশিত বা চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাহলে প্রতিপক্ষ ভয়ে ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে। এ ধারণার সঙ্গে […]

ড. মাহফুজ পারভেজ
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি, কূটনীতি ও কৌশলের পাশাপাশি একটি অদ্ভুত ধারণা বহুদিন ধরে আলোচিত ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা উন্মাদ তত্ত্ব। এর মূল বক্তব্য হলো, যদি কোনো রাষ্ট্রনেতা নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন যেন তিনি যে কোনো সময় অপ্রত্যাশিত বা চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাহলে প্রতিপক্ষ ভয়ে ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে। এ ধারণার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত নাম হলো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও উত্তর ভিয়েতনাম যদি মনে করে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতেও পিছপা হবেন না, তাহলে তারা সমঝোতায় আগ্রহী হবে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে একই ধরনের আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা ছিল, ট্রাম্প তার আগের মেয়াদের মতোই অনিশ্চয়তা, হুমকি এবং ব্যক্তিগত অপ্রত্যাশিত আচরণকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করবেন। ট্রাম্প নিজেও একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বিশ্বনেতারা তাকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বা ‘পাগলাটে’ মনে করুক, সেটিই তার কৌশলগত সুবিধা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস বলে, শুধু ভয় সৃষ্টি করাই যথেষ্ট নয়। সেই ভয়কে বিশ্বাসযোগ্যও হতে হয়। কোনো রাষ্ট্রনেতা যদি বারবার চরম হুমকি দেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন না করেন, তাহলে প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে বুঝে যায় যে এটি কেবল চাপ সৃষ্টির কৌশল। তখন হুমকির কার্যকারিতা কমে যায়।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই দেখা গেছে, তিনি প্রায়ই সর্বোচ্চ মাত্রার ভাষা ব্যবহার করেছেন-কখনো উত্তর কোরিয়া, কখনো ইরান, কখনো চীনকে লক্ষ্য করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই বক্তব্য বাস্তব নীতিতে রূপ নেয়নি। ফলে প্রতিপক্ষের কাছে তার ‘অপ্রত্যাশিততা’ ধীরে ধীরে পরিচিত আচরণে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে এটিকে ‘credibility problem’ বা বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট বলা হয়। একজন নেতা যতই নিজেকে উন্মাদ হিসাবে উপস্থাপন করুন না কেন, যদি প্রতিপক্ষ বুঝতে পারে যে তিনি মূলত হিসাব-নিকাশ করেই সিদ্ধান্ত নেন তথা তার পাগলামি উদ্দেশ্যমূলক ও পরিকল্পিত, তাহলে উন্মাদ তত্ত্বের কার্যকারিতা হারিয়ে যায়। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের এ কৌশল বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও কঠোর ভাষা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক হুমকির মিশ্রণ ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে তার বক্তব্যে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ কৌশলের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। সমর্থকরা দাবি করেন, এ কঠোর অবস্থান প্রতিপক্ষকে সমঝোতায় বাধ্য করেছে।
কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। আন্তর্জাতিক সংকটের ক্ষেত্রে কেবল ভাষার তীব্রতা নয়, বরং সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। কোনো একটি সাময়িক সমঝোতা বা অস্ত্রবিরতিকে ‘ম্যাডম্যান থিওরি’র সাফল্য হিসাবে দেখানো প্রায়ই অতিসরলীকরণ হয়ে যায়। বরং অনেক গবেষণা দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা মিত্র রাষ্ট্রগুলোকেও উদ্বিগ্ন করে তোলে। প্রতিপক্ষ যেমন নেতার আচরণ নিয়ে সন্দিহান হয়, তেমনি মিত্ররাও তার প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা হারাতে পারে। ফলে কৌশলগত সুবিধার বদলে কূটনৈতিক খরচ বাড়ে। এবং ‘প্রকৃত উন্মাদ’ বনাম ‘অভিনীত উন্মাদ’ নিয়ে এক ধরনের সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়।
ম্যাডম্যান থিওরির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এটি ধরে নেয় যে প্রতিপক্ষ যুক্তিবাদী এবং ভয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু যদি প্রতিপক্ষ নিজেই অত্যন্ত মতাদর্শিক, আবেগপ্রবণ বা ঝুঁকিপ্রবণ হয়, তাহলে এই কৌশল উল্টো ফল দিতে পারে। অর্থাৎ, ‘উন্মাদের অভিনয়’ তখন কার্যকর হয় না, যখন সামনে থাকে ‘প্রকৃত উন্মাদ’ অথবা এমন কোনো নেতৃত্ব, যারা প্রচলিত যুক্তির বাইরে সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত। এ অবস্থায় উভয় পক্ষের অনিশ্চয়তা সংঘাতকে কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এ ঝুঁকি আরও বেশি। মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বহু পক্ষ জড়িত জটিল সংকটের মধ্যে ভুল হিসাব বা ভুল বার্তার মূল্য হতে পারে ভয়াবহ। যুক্তি ও কৌশলের বাইরে নিছক পাগলামি প্রকারান্তরে আত্মহত্যার শামিল হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিঃসন্দেহে প্রচলিত কূটনৈতিক ধ্যানধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। কিন্তু ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ নিয়ে নতুন করে যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় খুব বেশি সফল বলে প্রতীয়মান হয় না। ভয় দেখানো কখনো কখনো সাময়িক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্যতা, সামর্থ্য এবং সুপরিকল্পিত কৌশল। অতএব, ট্রাম্পের অভিজ্ঞতা হয়তো আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়-বিশ্ব রাজনীতিতে ‘উন্মাদ’ হিসাবে পরিচিত হওয়ার চেয়ে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হিসাবে পরিচিত হওয়াই অধিক শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পদ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কৌশল কি বাস্তবেই কাজ করে? করলেও কতটুকু করে? বিশেষত, একজন নেতার জন্য ‘ভয় দেখানো’ আর ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’র মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হয়। নইলে তিনি ভয়ের মানুষে পরিণত হবেন, বিশ্বাস বা আস্থার নেতা হতে পারবেন না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মতো দেশীয় রাজনীতিতেও এমন অনেক চরিত্র দেখা যায়, যারা নিজেদের অপরিহার্য, অপ্রত্যাশিত বা সর্বশক্তিমান হিসাবে তুলে ধরতে চান। কেউ প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট দেখান, কেউ দলীয় প্রভাবের ভয় দেখান, কেউ আবার জনসমর্থনের অতিরঞ্জিত দাবি করেন। কিছু সময়ের জন্য এতে প্রতিপক্ষ কিংবা অনুসারীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হতে পারে। কিন্তু ভয় থেকে জন্ম নেওয়া আনুগত্য সাধারণত ক্ষণস্থায়ী হয়। সুযোগ বা পরিস্থিতি বদলালেই তা ভেঙে পড়ে।
রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব নেতা নিজেদের চারপাশে ভয়ের আবহ তৈরি করেছেন, তারা ক্ষমতায় থাকাকালে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে হলেও সংকটের মুহূর্তে দ্রুত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। বিপরীতে, যেসব নেতা আস্থা, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছেন, তাদের প্রভাব ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক সীমা ছাড়িয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যেমন কিছু শাসক কঠোরতার জন্য নিন্দনীয় হয়েছেন, তেমনি কিছু নেতা জনগণের আস্থা অর্জনের কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রাসঙ্গিক ও স্মরণীয় থেকেছেন।
বাংলাদেশেও দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা, প্রশাসনিক প্রভাব, দলীয় আধিপত্য বা মাঠের শক্তি হাতে পেয়ে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রকাশ্যে বা আড়ালে নিজেদের ‘অপ্রতিরোধ্য’ বা ‘ম্যাডম্যান’ চরিত্রে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। তারা মনে করেছেন যে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রদর্শনই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। স্বল্পমেয়াদে এতে কিছু সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল টেকসই হয়নি। গণতন্ত্রের অবক্ষয় সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই কর্তৃত্ববাদ, অপব্যবহার, দুর্নীতি, দমন-পীড়ন কিংবা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার অভিযোগ সামনে এসেছে। যে ব্যক্তিরা একসময় ভয়ের প্রতীক ছিলেন, পরবর্তী সময়ে তারাই বিতর্ক ও সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়ে পালিয়ে গেছেন।
বাংলাদেশের মতো মধ্যম আকারের রাষ্ট্রের জন্য এ পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য সাধারণত ভয় প্রদর্শন থেকে আসে না। আসে বিশ্বাসযোগ্যতা, ধারাবাহিকতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য থেকে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির শক্তি বরাবরই ছিল সংযম, বহুমাত্রিক কূটনীতি এবং বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা। পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় এই বাস্তববাদী অবস্থানই অধিক কার্যকর। কারণ হটকারি ও অনিশ্চয়তার রাজনীতি স্বল্পমেয়াদে মনোযোগ আকর্ষণ করলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।
রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা, ধারাবাহিকতা ও কৌশলগত ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি। গণতন্ত্রকে সংরক্ষণ, রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখা এবং ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার উত্থান রুখতে এসব গুণের কোনো বিকল্প নেই। ভয়, হুমকি বা প্রতিপক্ষকে দমন করার রাজনীতি সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বৈধতা ও জনআস্থা ক্ষয় করে। বিপরীতে, নীতি ও আচরণে ধারাবাহিকতা, প্রতিষ্ঠানকে সম্মান, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং ক্ষমতার ব্যবহারে সংযম একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলে। এর মাধ্যমেই স্থায়ী রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হয় এবং রাষ্ট্র-ক্ষমতা ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি, দাপট ও পাগলামি প্রদর্শনের বদলে প্রকৃত অর্থেই একটি গণতান্ত্রিক অবয়ব ও শান্তিপূর্ণ কাঠামো লাভ করতে পারে।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)





