অর্থ পাচার (মানিলন্ডারিং), হুন্ডি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়ন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ (বিএফআইইউ)-এর তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান সক্ষমতাকে বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অপরাধচক্রের কৌশল প্রতিনিয়ত বদলানোর প্রেক্ষাপটে গোয়েন্দা নজরদারিতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আনার লক্ষ্যে দুটি আধুনিক সফটওয়্যার—ফাইভকাস্ট ওনিক্স (Fivecast ONYX) এবং চেইনঅ্যালাইসিস রিঅ্যাক্টর (Chainalysis Reactor) কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে এ সংক্রান্ত এক চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সফটওয়্যারগুলো সংযোজিত হলে দেশের আর্থিক খাতের সুরক্ষায় এবং গোপন অর্থ লেনদেনের জটিল জাল ভেদ করতে বিএফআইইউ আরো বেশি কার্যকর ও গতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ জুন মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধের লক্ষ্যে বিএফআইইউয়ের তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের পরিধি বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশনার আলোকে দুটি সফটওয়্যার সংযোজন ও তা ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে পূর্বানুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
পরবর্তী সময়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০০৮-এর বিধি অনুযায়ী সফটওয়্যার দুটি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির দর প্রস্তাব মূল্যায়ন, কারিগরি গ্রহণযোগ্যতা যাচাই এবং একমাত্র দরদাতার সঙ্গে সফলভাবে নেগোসিয়েশনের জন্য ডেপুটি গভর্নর-৪-এর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশেষ কমিটির নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বহিরাগত সদস্য হিসেবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে একজন উপযুক্ত কর্মকর্তাকে মনোনয়ন দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে বিএফআইইউ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আর্থিক খাতের সুরক্ষায় সফটওয়্যার দুটির কার্যক্রম খুবই কার্যকর। এর মধ্যে ‘ফাইভকাস্ট ওনিক্স’ মূলত ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বা উন্মুক্ত উৎস প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এটি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন ফোরাম, চ্যাট গ্রুপ এবং ডার্ক ওয়েব থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ ও গভীর বিশ্লেষণ করতে পারে। এর মাধ্যমে অপরাধী চক্র বা মানিলন্ডারিংয়ে জড়িত ব্যক্তিরা অনলাইনে কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করছে, তাদের মধ্যে ভার্চুয়াল বা আর্থিক যোগসূত্র কোথায় এবং তাদের সহযোগীরা কারা—তা খুব সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব ।
অন্যদিকে, ‘চেইনঅ্যালাইসিস রিঅ্যাক্টর’ বিশেষভাবে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ওপর নজরদারির জন্য তৈরি করা হয়েছে। ফাইভকাস্ট ওনিক্স এবং চেইনঅ্যালাইসিস রিঅ্যাক্টরের মতো বিশ্বমানের সফটওয়্যারগুলো বিএফআইইউয়ের হাতে যুক্ত হলে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ট্র্যাকিং, সোশ্যাল মিডিয়া ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষণ এবং জটিল মানিলন্ডারিং চক্রের নেটওয়ার্ক উদঘাটন অনেক সহজ হবে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, অর্থ পাচার (মানিলন্ডারিং), হুন্ডি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়ন প্রতিরোধে সময়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে অপরাধের ধরন পাল্টেছে, তাই এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। বিএফআইইউ মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে নতুন সফটওয়্যার সংযোজনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি সিদ্ধান্ত।