Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ বিবেকবার্তা

প্রচ্ছদ / আন্তর্জাতিক
১:২৮ পিএম, ২৯ আগস্ট ২০২৬

বন্যায় ভেসে আসা লাশ সংরক্ষণ ও শনাক্তে হিমশিম খাচ্ছে নেপাল

বন্যায় ভেসে আসা লাশ সংরক্ষণ ও শনাক্তে হিমশিম খাচ্ছে নেপাল
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর নদীতে ভেসে আসা একের পর এক লাশ উদ্ধার হচ্ছে। কিন্তু লাশ উদ্ধারের পরই নতুন সংকটে পড়েছে প্রশাসন। হাসপাতালের মর্গগুলোতে জায়গা নেই। পর্যাপ্ত হিমায়িত সংরক্ষণব্যবস্থাও নেই। ফলে লাশ সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

ভোটেকোশি নদীর প্রলয়ংকরী বন্যায় প্রাণ হারানো মানুষের লাশ স্রোতের তোড়ে বহু দূর ভেসে গেছে। বন্যার উৎপত্তিস্থল রসুয়া ও নুয়াকোট থেকে ভেসে যাওয়া লাশ এখন নুয়াকোট ছাড়িয়ে চিতওয়ান, তনহুন, নবলপরাসীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে।

নুয়াকোট, ধাদিং ও নবলপরাসী জেলার হাসপাতালের মর্গে লাশ রাখার জায়গা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তাই কিছু লাশ পাশের জেলাগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পোখরাতেও।

চিতওয়ানে ১৩৭ লাশ উদ্ধার

সবচেয়ে সংকট তৈরি হয়েছে চিতওয়ান জেলায়। সরকারি হিসাবে, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চিতওয়ান অঞ্চলের ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর ফিশলিং থেকে গোলাঘাট পর্যন্ত অংশ থেকেই ১৩৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে।

চিতওয়ানের সব হাসপাতালের মর্গে একসঙ্গে ৩০ থেকে ৫০টি লাশ রাখা যায়। এই সীমিত সক্ষমতার ওপর ইতোমধ্যে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ভরতপুরে একটি অস্থায়ী মর্গ তৈরি করছে প্রশাসন। ভরতপুর মহানগরীর বিদ্যুৎ রোডের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’-এর একটি পরিত্যক্ত ভবনকে এ কাজে ব্যবহার করা হবে।

গত বৃহস্পতিবার চিতওয়ানের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার (সিডিও) গণেশ আরিয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গণেশ আরিয়াল জানান, অস্থায়ী মর্গে প্রায় ২৫০টি লাশ রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই জায়গাও পূর্ণ হয়ে গেলে বিকল্প হিসেবে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশান ব্যবহার করা হবে।

ভরতপুর মহানগর কর্তৃপক্ষ ভবনটি মেরামত ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে প্রস্তুত করছে। লাশ সংরক্ষণে সেখানে এসি বসানো হচ্ছে। ব্যবহার করা হবে ড্রাই আইসও। চিতওয়ানের বিভিন্ন শিল্প ও বণিক সমিতি ড্রাই আইস সরবরাহের খরচ ও দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছে।

নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে ভিড়

লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে চিতওয়ানে আসছেন বিভিন্ন জেলার মানুষ। রসুয়া, নুয়াকোট ও গোরখাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবারের সদস্যরা ভরতপুরে ছুটে আসছেন।

বৃহস্পতিবার ভরতপুরের পরিত্যক্ত ভবনটিকে অস্থায়ী মর্গে রূপান্তরের কাজ চলছিল। তখনও সেখানে নিখোঁজ স্বজনদের তথ্য জানতে ভিড় ছিল।

প্রচণ্ড গরমে তাঁবুর ছায়ায় অপেক্ষা করছিলেন ইয়ামান বানু। বন্যার পর নুয়াকোটের ত্রিশূলী বাজারে তার দাদি ও নানি নিখোঁজ হন। ইয়ামান জানান, তার দাদি সাকলা ও নানি নাজাবুন নিশার এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

গোরখার পালুংটার এলাকার মায়া বানিয়া খাড়কাও নিখোঁজ। তিনি গোসাইকুন্ডায় তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। তার দুই ভাই কৃষ্ণ বাহাদুর ও হরি বানিয়া বোনের একটি ছবি হাতে নিয়ে ভরতপুরের অস্থায়ী কেন্দ্রে এসেছেন।

মর্গের প্রস্তুতি পুরোপুরি শেষ না হলেও সকাল থেকেই সেখানে স্বজনদের আনাগোনা বাড়ছে। তাদের আশা, উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর মধ্যে তাদের প্রিয়জন আছেন কি না, দ্রুত তা নিশ্চিত করা যাবে।

পোখরায় দুই দিনে ৯৩ লাশ

ভেসে আসা লাশে পোখরার মর্গগুলোও পূর্ণ হয়ে গেছে। আশপাশের কয়েকটি জেলায় জায়গা না থাকায় লাশ পাঠানো হচ্ছে এই পর্যটন নগরীতে।

গত দুই দিনে তনহুন, গোরখা, পূর্ব নবলপরাসী ও ধাদিং জেলা থেকে মোট ৯৩টি লাশ পোখরায় আনা হয়েছে।

কাস্কি জেলার সিডিও কুমান সিং গুরুং জানান, পোখরা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সেসসহ জেলার হাসপাতালগুলোতে সর্বোচ্চ ৮৮টি লাশ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে পোখরা একাডেমিতে ৭২টি এবং নেপাল মণিপাল টিচিং হাসপাতালে ৮টি লাশ রাখা যায়। গণ্ডকী মেডিক্যাল কলেজসহ ছোট হাসপাতালগুলোতে দুটি করে লাশ রাখার ব্যবস্থা আছে।

বন্যা শুরুর আগেই মর্গগুলোতে পাঁচটি লাশ ছিল।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বুধবার তনহুন থেকে নয়টি লাশ পোখরায় আনা হয়। বৃহস্পতিবার পূর্ব নবলপরাসী থেকে ৪১টি, ধাদিং থেকে ২৭টি এবং গোরখা থেকে আরো ১১টি লাশ সেখানে পৌঁছায়।

কুমান সিং গুরুং বলেন, ‘ইতোমধ্যেই সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। আপাতত কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। আরো লাশ আসতে থাকলে আমাদের পাশের জেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।’

তিনি জানান, তনহুনে আরো ৯টি, লামজুঙে চারটি এবং গোরখায় দুটি লাশ রাখার জায়গা খালি আছে। প্রয়োজন হলে বাগলুং, পর্বত ও স্যাংজা জেলাতেও লাশ পাঠানো হতে পারে।

বিশেষ ব্যাগ ও সংরক্ষণব্যবস্থার সংকট

লাশ বহনের জন্য বিশেষায়িত ব্যাগেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। মোট ২৩৪টি ব্যাগের মধ্যে ১১৭টি পূর্ব নবলপরাসীর মধ্যবিন্দু জেলা হাসপাতাল ও নেপাল রেডক্রসের কাছে পাঠানো হয়েছে। বাকি ১১৭টি পোখরায় ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে।

পোখরা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সেসের তথ্য কর্মকর্তা সুশীল আরিয়াল জানান, বর্তমানে মর্গে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় লাশ রাখা হচ্ছে। এই তাপমাত্রায় একটি লাশ বড়জোর ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ ভালো রাখা সম্ভব।

এর বেশি সময় লাশ সংরক্ষণ করতে হলে শূন্য বা মাইনাস ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার আধুনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু পোখরায় এ ধরনের কোনো কোল্ডস্টোরেজ বা ফ্রিজিং সুবিধা নেই।

সুশীল আরিয়াল বলেন, নদী থেকে এখনো নিয়মিত লাশ উদ্ধার হচ্ছে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া লাশ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে।

শনাক্ত না হলে দাফন

লাশ সংরক্ষণের পাশাপাশি অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশ দাফনের প্রস্তুতিও শুরু করেছে প্রশাসন।

কাস্কি জেলার পুলিশ সুপার নবীন কার্কি জানান, ‘পরিচয়হীন ও দাবিহীন লাশ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা–২০২১’ অনুযায়ী জেলা পুলিশপ্রধানের নেতৃত্বে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, পরিচয়হীন কোনো লাশ মর্গ থেকে নেওয়ার আগে পুলিশ তার ছবি তুলবে, আঙুলের ছাপ নেবে, ময়নাতদন্ত করবে এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করবে। যেসব লাশের মুখমণ্ডল চেনা সম্ভব, সেগুলোর ছবি সাধারণ মানুষের জন্য প্রকাশ করা হচ্ছে, যাতে নিখোঁজ স্বজনেরা তা দেখে শনাক্ত করতে পারেন।

নবীন কার্কি বলেন, ‘আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ নমুনা আগে থেকেই সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে। যদি কোনো লাশের স্বজনদের খুঁজে না পাওয়া যায় কিংবা পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না–ও হয়, তাহলে আমরা এগুলোকে মর্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য রেখে দিতে পারব না।’

অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশগুলো একটি নিরাপদ ও নির্দিষ্ট স্থানে সমাহিত করতে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে জায়গা নির্ধারণের কাজ চলছে।

দাফনের সময় প্রতিটি লাশের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট ‘ট্যাগ নম্বর’ যুক্ত করা হবে। পরে দাফনের যাবতীয় তথ্যের সঙ্গে ওই নম্বর নথি হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। মহানগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই দাফনের স্থান চূড়ান্ত করা হবে।

পুলিশের আশঙ্কা, অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কমিটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে যেসব লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হবে না, সেগুলোর দাফন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট

এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
Advertise with us
আরও বিবেকবার্তা সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com